০১:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
এক মহান মুক্তিযোদ্ধার বিদায়: ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও শ্রদ্ধার শেষ অধ্যায়

সাংবাদিক মো. শাহজাহান বাশারের মেজো চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অব.) হাফিজ উদ্দিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চিরনিদ্রায় শায়িত

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:২৭:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
  • ৩০০৪ বার পঠিত হয়েছে

মোঃ শাহজাহান বাশার

কুমিল্লা জেলার বুড়িচং উপজেলার বাকশিমুল ইউনিয়নের আনন্দপুর পশ্চিম পাড়ার কৃতি সন্তান, সাংবাদিক মো. শাহজাহান বাশারের মেজো চাচা এবং গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের একজন সাহসী যোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অবসরপ্রাপ্ত) হাফিজ উদ্দিন আর আমাদের মাঝে নেই। জাতির এই কৃতী সন্তান আজ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন।

একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তির প্রস্থান নয়; এটি একটি ইতিহাসের পাতা নিভে যাওয়া, একটি সংগ্রামী জীবনের সমাপ্তি এবং জাতির স্মৃতিতে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি।

আজ বাদ আছর কালিকাপুর ভূমি অফিসের সামনে মরহুমের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজাকে ঘিরে এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয় এক গভীর আবেগঘন পরিবেশ। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, আত্মীয়-স্বজন এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ জানাজায় অংশগ্রহণ করেন।

জানাজা শেষে মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত জনতা এক অভিভাবকতুল্য মুক্তিযোদ্ধার বিদায়ে চোখের পানি সংবরণ করতে পারেননি।

জানাজার পর বুড়িচং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অব.) হাফিজ উদ্দিনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এ সময় প্রশাসনের প্রতিনিধি, সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা এবং এলাকাবাসী গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে তাঁকে শেষ বিদায় জানান।

গার্ড অব অনারের মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত বেদনাবিধুর ও গর্বের—যেখানে একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শিত হয়, আবার একই সঙ্গে একটি প্রজন্মের স্মৃতিতে বাজে বিদায়ের বেদনা।

পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মরহুম হাফিজ উদ্দিন চার ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তিনজনই ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এই পরিবারটি কেবল একটি পরিবার নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক সাহসী ও আত্মত্যাগী অধ্যায়ের নাম।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অসীম সাহসিকতা, দৃঢ় মনোবল ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর অবদান এবং ত্যাগ আজও এলাকাবাসীর মুখে মুখে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী জীবনে তিনি সেনা বাহিনীর সুবেদার হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসর গ্রহণ করেন। কর্মজীবনে তিনি সততা, নিষ্ঠা ও মানবিকতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা এলাকার মানুষ আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।

তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, সহজ-সরল এবং মানুষের বিপদে সবসময় পাশে থাকা একজন অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্ব।

তাঁর মৃত্যুতে আনন্দপুর পশ্চিম পাড়া ও আশপাশের এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন।

এলাকাবাসীর ভাষায়, “তিনি শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের ছায়া, আমাদের গর্ব, আমাদের পথপ্রদর্শক।”

বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অব.) হাফিজ উদ্দিনের জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা। তাঁর জীবনসংগ্রাম, দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

একজন মুক্তিযোদ্ধার বিদায় মানে শুধু একটি জীবন শেষ হওয়া নয়, বরং একটি আদর্শের আলো নিভে যাওয়া—যা পরবর্তী প্রজন্মকে বারবার জাগিয়ে তুলবে।

মহান আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা—তিনি যেন মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অব.) হাফিজ উদ্দিনকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন এবং তাঁর শোকাহত পরিবারকে এই অপূরণীয় শোক সহ্য করার শক্তি দান করেন।

এলাকাবাসী, সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

রংপুরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫ তম শাহাদাৎ বার্ষিকী পালিত

এক মহান মুক্তিযোদ্ধার বিদায়: ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও শ্রদ্ধার শেষ অধ্যায়

সাংবাদিক মো. শাহজাহান বাশারের মেজো চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অব.) হাফিজ উদ্দিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চিরনিদ্রায় শায়িত

Update Time : ১১:২৭:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬

মোঃ শাহজাহান বাশার

কুমিল্লা জেলার বুড়িচং উপজেলার বাকশিমুল ইউনিয়নের আনন্দপুর পশ্চিম পাড়ার কৃতি সন্তান, সাংবাদিক মো. শাহজাহান বাশারের মেজো চাচা এবং গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের একজন সাহসী যোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অবসরপ্রাপ্ত) হাফিজ উদ্দিন আর আমাদের মাঝে নেই। জাতির এই কৃতী সন্তান আজ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন।

একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তির প্রস্থান নয়; এটি একটি ইতিহাসের পাতা নিভে যাওয়া, একটি সংগ্রামী জীবনের সমাপ্তি এবং জাতির স্মৃতিতে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি।

আজ বাদ আছর কালিকাপুর ভূমি অফিসের সামনে মরহুমের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজাকে ঘিরে এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয় এক গভীর আবেগঘন পরিবেশ। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, আত্মীয়-স্বজন এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ জানাজায় অংশগ্রহণ করেন।

জানাজা শেষে মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত জনতা এক অভিভাবকতুল্য মুক্তিযোদ্ধার বিদায়ে চোখের পানি সংবরণ করতে পারেননি।

জানাজার পর বুড়িচং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অব.) হাফিজ উদ্দিনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এ সময় প্রশাসনের প্রতিনিধি, সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা এবং এলাকাবাসী গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে তাঁকে শেষ বিদায় জানান।

গার্ড অব অনারের মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত বেদনাবিধুর ও গর্বের—যেখানে একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শিত হয়, আবার একই সঙ্গে একটি প্রজন্মের স্মৃতিতে বাজে বিদায়ের বেদনা।

পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মরহুম হাফিজ উদ্দিন চার ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তিনজনই ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এই পরিবারটি কেবল একটি পরিবার নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক সাহসী ও আত্মত্যাগী অধ্যায়ের নাম।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অসীম সাহসিকতা, দৃঢ় মনোবল ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর অবদান এবং ত্যাগ আজও এলাকাবাসীর মুখে মুখে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী জীবনে তিনি সেনা বাহিনীর সুবেদার হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসর গ্রহণ করেন। কর্মজীবনে তিনি সততা, নিষ্ঠা ও মানবিকতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা এলাকার মানুষ আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।

তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, সহজ-সরল এবং মানুষের বিপদে সবসময় পাশে থাকা একজন অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্ব।

তাঁর মৃত্যুতে আনন্দপুর পশ্চিম পাড়া ও আশপাশের এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন।

এলাকাবাসীর ভাষায়, “তিনি শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের ছায়া, আমাদের গর্ব, আমাদের পথপ্রদর্শক।”

বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অব.) হাফিজ উদ্দিনের জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা। তাঁর জীবনসংগ্রাম, দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

একজন মুক্তিযোদ্ধার বিদায় মানে শুধু একটি জীবন শেষ হওয়া নয়, বরং একটি আদর্শের আলো নিভে যাওয়া—যা পরবর্তী প্রজন্মকে বারবার জাগিয়ে তুলবে।

মহান আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা—তিনি যেন মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অব.) হাফিজ উদ্দিনকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন এবং তাঁর শোকাহত পরিবারকে এই অপূরণীয় শোক সহ্য করার শক্তি দান করেন।

এলাকাবাসী, সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন।