
মোঃ শাহজাহান বাশার,
রাতের শহর নিউইয়র্ক। ব্যস্ত সড়কে ছুটে চলছে একটি হলুদ ট্যাক্সি। স্টিয়ারিংয়ে বসে আছেন এক বাংলাদেশি প্রবাসী। যাত্রীরা হয়তো জানেন না—এই সাধারণ ট্যাক্সিচালকের হাতেই গড়ে উঠছে হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন। তিনি মোশারফ হোসেন খান চৌধুরী—একজন নিঃশব্দ বিপ্লবী, যিনি নিজের জীবনকে বিলাসিতায় নয়, উৎসর্গ করেছেন সমাজের কল্যাণে।
সময় পেলেই তিনি দেখেন বলিউডের আলোচিত সিনেমা “মাঝি দ্য মাউন্টেন ম্যান”। ভারতের দশরথ মাঝি যেমন পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করেছিলেন, তেমনি মোশারফও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তবে তিনি পাথর ভেঙেছেন রাস্তা বানাতে নয়, বরং শিক্ষার পথ নির্মাণে। তার জীবন যেন বাস্তবের এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামে জন্ম নেওয়া মোশারফ ছোটবেলাতেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। স্কুলশিক্ষক বাবার মৃত্যুর পর এসএসসির আগেই পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। ছয় ভাই-বোনের সংসার চালাতে তাকে পাড়ি জমাতে হয় বিদেশে—প্রথমে কাতার, পরে যুক্তরাষ্ট্রে। নিজের পড়াশোনা বেশি দূর এগিয়ে নিতে না পারলেও ভাই-বোনদের শিক্ষার দায়িত্ব তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন।
১৯৯২ সালে নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালানোর লাইসেন্স পাওয়ার পর শুরু হয় তার নতুন সংগ্রাম। দিন-রাত পরিশ্রম করে উপার্জন করলেও তিনি নিজের জন্য বিলাসী জীবন বেছে নেননি। বরং সেই অর্থের বড় অংশ ব্যয় করেছেন নিজ এলাকার মানুষের কল্যাণে। তার ঘামে ভেজা উপার্জনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দুটি কলেজ, একটি উচ্চ বিদ্যালয়, দুটি মাদরাসা এবং একটি কিন্ডারগার্টেন। পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন দুটি পাঠাগার, যা স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
একসময় ধান্যদৌল ও আশপাশের এলাকায় কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না। অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা হলেও কেউ জমি দিতে এগিয়ে আসেনি। সেই সময় তরুণ মোশারফ সাহস করে ঘোষণা দেন—তিনি নিজেই জমি কিনে স্কুল প্রতিষ্ঠা করবেন। তার সেই উদ্যোগেই ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়, যা আজ হাজারো শিক্ষার্থীর আলোকবর্তিকা হিসেবে পরিচিত।
শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি মানবিক কাজেও তিনি রেখেছেন অসামান্য অবদান। ব্রাহ্মণপাড়ায় ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের জমি দান করেছেন তিনি। গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য গড়ে তুলেছেন বৃত্তি কার্যক্রম, যার মাধ্যমে ইতোমধ্যে ২০০ জন শিক্ষার্থী উপকৃত হয়েছে। এছাড়া গৃহহীন ১০টি পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন। মসজিদ, ঈদগাহ ও কবরস্থানের উন্নয়নেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—এত কিছু করার পরও তিনি নিজে প্রবাসে অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করেন। এখনো মেসে থাকেন এবং সাধারণ খাবারেই দিন কাটান। স্ত্রী-সন্তানদের যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাননি শুধুমাত্র খরচ কমিয়ে সেই অর্থ দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার জন্য। তার এই ত্যাগের পেছনে রয়েছে পরিবার, বিশেষ করে স্ত্রী ফয়জুন নাহার চৌধুরীর নীরব সমর্থন।
বর্তমানে তার বয়স ৬২ বছর। কিন্তু জীবনসংগ্রামের এই যোদ্ধা থেমে যাননি। নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেছেন এবং স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়ন করছেন। তার বিশ্বাস—পড়াশোনার কোনো বয়স নেই।
আজ তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তার নামের কলেজটি কুমিল্লা বোর্ডের সেরা কলেজগুলোর মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। তার স্বপ্ন—ব্রাহ্মণপাড়ার প্রতিটি ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া।
মোশারফ হোসেন খান চৌধুরী প্রমাণ করেছেন—মানুষ বড় হয় পদ বা সম্পদ দিয়ে নয়, বড় হয় তার কাজ ও মানসিকতার মাধ্যমে। তিনি কোনো রাজনীতিবিদ নন, কোনো বড় শিল্পপতিও নন। তবুও তার অবদান একটি প্রজন্মকে আলোকিত করছে।
ট্যাক্সির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে তিনি শুধু পথ পাড়ি দেন না, বদলে দেন অসংখ্য মানুষের জীবনের দিকনির্দেশনা। তার এই নীরব বিপ্লব একদিন বাংলাদেশের শিক্ষা ও মানবকল্যাণে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

Reporter Name 












