
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসজুড়ে আজ বুধবার (১৫ অক্টোবর) বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে শুরু হওয়া ভোটগ্রহণ চলবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, এই নির্বাচন শুধুমাত্র প্রার্থী নির্বাচনের প্রতিযোগিতা নয়— এটি ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক চর্চার পুনরুজ্জীবন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সপ্তমবারের মতো আয়োজিত এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ও আনন্দের বন্যা বইছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চাকসুর মোট ২৬টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৪১৫ জন প্রার্থী। পাশাপাশি ১৪টি আবাসিক হল ও একটি হোস্টেলে আরও ৪৯৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সব মিলিয়ে মোট প্রার্থীর সংখ্যা ৯০৮ জন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী রয়েছেন ৪৭ জন।
মোট ২৭ হাজার ৫১৮ জন শিক্ষার্থী আজ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। বিকেল চারটায় ভোটগ্রহণ শেষে ওএমআর (OMR) পদ্ধতিতে ভোট গণনা শুরু হবে। হল সংসদের ফলাফল সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রেই ঘোষণা করা হবে, আর কেন্দ্রীয় সংসদের ফলাফল ঘোষণা করা হবে ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের মিলনায়তনে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এবার ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে পাঁচটি অনুষদের ভবনে গঠিত ১৫টি ভোটকেন্দ্রে। এসব কেন্দ্রে মোট ৬০টি ভোটকক্ষ ও ৬৮৯টি বুথ স্থাপন করা হয়েছে।
প্রকৌশল অনুষদ ভবনে সোহরাওয়ার্দী হলের ৪,০৩৬ জন ভোটার,কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের নতুন ভবনে (শহীদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ভবন) ভোট দেবেন ৫,২৬৩ জন,বিজ্ঞান অনুষদ ভবনে ৪,৫৩৮ জন,সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবনে ৬,৬০৬ জন,ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ভবনে ৭,০৭৩ জন ভোটার রয়েছেন
ভোটকেন্দ্রগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ভোটকক্ষে গোপন বুথের বাইরে স্থাপন করা হয়েছে ৯০টি সিসিটিভি ক্যামেরা। পাশাপাশি ১৫টি ভোটকেন্দ্রে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য বসানো হয়েছে ২০টি এলইডি স্ক্রিন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী জানান, “পুরো ক্যাম্পাসকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। পুলিশ, এপিবিএন, বিজিবি, র্যাবসহ প্রায় ১,২০০ জন নিরাপত্তা সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। র্যাবের আটটি প্লাটুন থাকবে ফলাফল ঘোষণার পর পর্যন্ত।”
চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু বলেন, “চাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় সব ইউনিট প্রস্তুত আছে।”
প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মনির উদ্দিন বলেন, “আমরা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। শিক্ষার্থীদের নির্বিঘ্নে ভোট উৎসবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি ভবনের প্রিজাইডিং অফিসার অধ্যাপক মোহাম্মদ ফজলুর কাদের বলেন, “সকাল সাড়ে নয়টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিকেল চারটা পর্যন্ত চলবে। ভোটাররা উৎসাহীভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিচ্ছেন। আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন।”
ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অনুষদ ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিচ্ছেন। কেউ কেউ নিজের পছন্দের প্রার্থীর ব্যানার হাতে নিয়ে উল্লাস করছেন, আবার অনেকে ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখছেন।
বছরের পর বছর পর এমন গণতান্ত্রিক উৎসবে অংশ নিতে পেরে শিক্ষার্থীরা আনন্দিত। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রাব্বি বলেন, “আমরা চাই চাকসু নিয়মিত হোক। এই নির্বাচন শুধু প্রার্থী বাছাই নয়, এটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতন্ত্রের প্রতীক।”
চাকসু নির্বাচন ঘিরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন এক প্রাণবন্ত দিন পার করছে শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ তিন দশকের অপেক্ষার পর ফিরে আসা এই গণতান্ত্রিক চর্চা শিক্ষার্থীদের মনে নতুন প্রত্যাশা ও আশার সঞ্চার করেছে।





















