০৭:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুমিল্লার ব্যাংকটির শাখা ছিল সুদূর লন্ডনেও

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:৪২:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • ৩০২৭ বার পঠিত হয়েছে

মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

কুমিল্লা শহরকে একসময় বলা হতো ‘ব্যাংক ও ট্যাংকের শহর’। ইতিহাসে উজ্জ্বল এই শহরে শুধু ধর্মসাগর, নানুয়ার দিঘি বা রানির দিঘির মতো বিখ্যাত জলাশয়ই নয়, ছিল আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থারও সূচনা। আজ থেকে ১০৭ বছর আগে, অর্থাৎ ১৯১৪ সালে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দেশের অন্যতম প্রাচীন ব্যাংক ‘দ্য কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশন’। আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই ব্যাংকের শাখা ছিল শুধু কুমিল্লা বা কলকাতাতেই নয়, সুদূর লন্ডনেও।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর বাংলার অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার হয়। কুমিল্লার মতো শহরগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। উদীয়মান ব্যবসায়ী সমাজ বুঝতে পারে, বৃহৎ লেনদেন ও বাণিজ্যের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রয়োজন। এই চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯১৪ সালে গড়ে ওঠে কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশন।

ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নরেন্দ্র চন্দ্র দত্ত—যিনি মূলত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের কালিকচ্ছ গ্রামের সন্তান হলেও কুমিল্লাতেই ব্যবসার প্রসার ঘটান। পেশায় আইনজীবী হলেও তিনি বহুমুখী ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর মালিকানায় ছিল মনতলা টি এস্টেট, মনতলা ইস্পাত কারখানা এবং কুমিল্লা শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবসা। কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশন তাঁর সেই দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্যোগের প্রতিফলন।

বর্তমানে কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়ে যে লাল দালানটি পূবালী ব্যাংকের শাখা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিই ছিল কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশনের প্রধান কার্যালয়। এই ভবনটি বিশেষভাবে ব্যাংকটির জন্য নির্মিত হয়েছিল। তখনকার দিনে এমন আধুনিক অবকাঠামো কুমিল্লার আর্থিক গুরুত্বের প্রমাণ বহন করে।

কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশনের কার্যক্রম ছিল ব্যাপক। শুধু কুমিল্লা নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ঢাকায়ও ছিল এর শাখা। ভারতের কলকাতা, দিল্লি, লখনৌ, কানপুর, মুম্বাইসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্রে ব্যাংকটির উপস্থিতি ছিল। আরও বিস্ময়ের বিষয়, সুদূর ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনেও ব্যাংকটির একটি শাখা চালু হয়েছিল। যা প্রমাণ করে, শত বছরেরও আগে কুমিল্লা বৈশ্বিক আর্থিক লেনদেনের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছেছিল।

দেশ ভাগের পর নানা কারণে ব্যাংকটির কার্যক্রম সংকুচিত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি ব্যাংক একীভূত হয়ে ১৯৫০ সালে ইউনাইটেড ব্যাংক অব ইন্ডিয়া গঠিত হয়। ফলে কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশনও হারিয়ে যায় সময়ের স্রোতে। আজ সেই ব্যাংক নেই, শুধু রয়ে গেছে স্মৃতি আর কান্দিরপাড়ের ঐতিহাসিক লাল দালান।

একসময় কুমিল্লার ট্যাংকগুলোর মতোই ব্যাংকগুলোর অস্তিত্বও শহরের গৌরবের অংশ ছিল। আজ বহু দিঘি ভরাট হয়ে গেছে, ব্যাংকগুলো মিশে গেছে ইতিহাসে। তবু কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশনের এই কাহিনি প্রমাণ করে, এ শহর একসময় ব্যবসা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির মিলনক্ষেত্র ছিল।

ইতিহাসবিদদের মতে, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান কেবল অর্থনীতিকে নয়, সমাজের আধুনিকতাকেও এগিয়ে নিয়েছিল। তাই কুমিল্লার ব্যাংকিং ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হলে গবেষণা, সংরক্ষণ ও সচেতনতার বিকল্প নেই।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

জামায়াতের মিথ্যাচার জনগণ ক্ষমা করবে না: মির্জা ফখরুল

কুমিল্লার ব্যাংকটির শাখা ছিল সুদূর লন্ডনেও

Update Time : ১০:৪২:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫

মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

কুমিল্লা শহরকে একসময় বলা হতো ‘ব্যাংক ও ট্যাংকের শহর’। ইতিহাসে উজ্জ্বল এই শহরে শুধু ধর্মসাগর, নানুয়ার দিঘি বা রানির দিঘির মতো বিখ্যাত জলাশয়ই নয়, ছিল আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থারও সূচনা। আজ থেকে ১০৭ বছর আগে, অর্থাৎ ১৯১৪ সালে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দেশের অন্যতম প্রাচীন ব্যাংক ‘দ্য কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশন’। আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই ব্যাংকের শাখা ছিল শুধু কুমিল্লা বা কলকাতাতেই নয়, সুদূর লন্ডনেও।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর বাংলার অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার হয়। কুমিল্লার মতো শহরগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। উদীয়মান ব্যবসায়ী সমাজ বুঝতে পারে, বৃহৎ লেনদেন ও বাণিজ্যের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রয়োজন। এই চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯১৪ সালে গড়ে ওঠে কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশন।

ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নরেন্দ্র চন্দ্র দত্ত—যিনি মূলত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের কালিকচ্ছ গ্রামের সন্তান হলেও কুমিল্লাতেই ব্যবসার প্রসার ঘটান। পেশায় আইনজীবী হলেও তিনি বহুমুখী ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর মালিকানায় ছিল মনতলা টি এস্টেট, মনতলা ইস্পাত কারখানা এবং কুমিল্লা শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবসা। কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশন তাঁর সেই দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্যোগের প্রতিফলন।

বর্তমানে কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়ে যে লাল দালানটি পূবালী ব্যাংকের শাখা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিই ছিল কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশনের প্রধান কার্যালয়। এই ভবনটি বিশেষভাবে ব্যাংকটির জন্য নির্মিত হয়েছিল। তখনকার দিনে এমন আধুনিক অবকাঠামো কুমিল্লার আর্থিক গুরুত্বের প্রমাণ বহন করে।

কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশনের কার্যক্রম ছিল ব্যাপক। শুধু কুমিল্লা নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ঢাকায়ও ছিল এর শাখা। ভারতের কলকাতা, দিল্লি, লখনৌ, কানপুর, মুম্বাইসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্রে ব্যাংকটির উপস্থিতি ছিল। আরও বিস্ময়ের বিষয়, সুদূর ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনেও ব্যাংকটির একটি শাখা চালু হয়েছিল। যা প্রমাণ করে, শত বছরেরও আগে কুমিল্লা বৈশ্বিক আর্থিক লেনদেনের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছেছিল।

দেশ ভাগের পর নানা কারণে ব্যাংকটির কার্যক্রম সংকুচিত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি ব্যাংক একীভূত হয়ে ১৯৫০ সালে ইউনাইটেড ব্যাংক অব ইন্ডিয়া গঠিত হয়। ফলে কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশনও হারিয়ে যায় সময়ের স্রোতে। আজ সেই ব্যাংক নেই, শুধু রয়ে গেছে স্মৃতি আর কান্দিরপাড়ের ঐতিহাসিক লাল দালান।

একসময় কুমিল্লার ট্যাংকগুলোর মতোই ব্যাংকগুলোর অস্তিত্বও শহরের গৌরবের অংশ ছিল। আজ বহু দিঘি ভরাট হয়ে গেছে, ব্যাংকগুলো মিশে গেছে ইতিহাসে। তবু কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশনের এই কাহিনি প্রমাণ করে, এ শহর একসময় ব্যবসা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির মিলনক্ষেত্র ছিল।

ইতিহাসবিদদের মতে, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান কেবল অর্থনীতিকে নয়, সমাজের আধুনিকতাকেও এগিয়ে নিয়েছিল। তাই কুমিল্লার ব্যাংকিং ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হলে গবেষণা, সংরক্ষণ ও সচেতনতার বিকল্প নেই।