
মো. শাহজাহান বাশার
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির রাজনীতিতে নতুন করে গতি এলেও দলটি যে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে—সেটি এখন দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে গ্রাসরুট পর্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সম্ভাব্য এবং ঘোষিত প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় সরব হলেও শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি, চেয়ারপার্সনের শারীরিক অবস্থা ও দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে সংঘাত বাড়তে থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রথম চ্যালেঞ্জ: তারেক রহমানের দেশে ফেরা—তারিখ অনিশ্চিত, প্রশ্ন বাড়ছে মাঠপর্যায়ে ,দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরও তিনি কবে দেশে ফিরবেন—সে বিষয়ে কোন নিশ্চিত বার্তা না পাওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে।
দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বলছেন, আন্দোলনের কঠিন সময় পার করে বিএনপি আজ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ালেও তারেক রহমান দেশে না ফিরলে সাংগঠনিক সমন্বয় ও নেতৃত্বের সংকট আরও প্রকট হতে পারে। তারেক রহমানের ফেরাকে কেন্দ্র করে দলে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় অনেকে হতাশাও প্রকাশ করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ এই প্রসঙ্গে বলেন—
“তারেক রহমান কেন ফিরছেন না বা কবে ফিরবেন—এ নিয়ে দলে স্পষ্ট বক্তব্য না থাকায় নানা গুজব ডালপালা মেলছে।”
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ: খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য—দুর্বলতা বাড়ায় নেতাকর্মীদের দুশ্চিন্তা
বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে “উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু হয়নি”—কিন্তু এই বক্তব্য নেতাকর্মীদের মনে কতটা স্বস্তি ফেরাতে পেরেছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিএনপির তৃণমূল বলছে, খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন—তিনি দলের মানসিক শক্তি ও প্রতীকের নাম। তার অসুস্থতা বাড়লে সেটির সরাসরি প্রভাব পড়ে সংগঠনের মনোবল ও নির্বাচনী প্রস্তুতির ওপর।
এক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতে—“খালেদা জিয়া বিএনপির কাছে এক শক্তির উৎস। তাই তার স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকাটাই স্বাভাবিক।”
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ: মনোনয়নকে ঘিরে অভ্যন্তরীণ বিরোধ—বহু আসনে জটিলতা চরমে-নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি ও সমমনা জোটের ভেতর মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে বিরোধ ক্রমাগত বাড়ছে।
বহু এলাকায় দুই-তিনজন শক্তিশালী নেতা একই আসনে মনোনয়ন দাবি করছেন, যার ফলে গ্রুপিং, বিভাজন এবং অভিযোগ-প্রত্যাঘাতের ঘটনা সামনে আসছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হলেও তৃণমূলে উত্তেজনা রয়ে গেছে।
এ ছাড়া সমমনা দলগুলোর জন্য কিছু আসন খালি রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও কয়েকটি জেলায় ক্ষোভ দেখা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি বিএনপির ভোটব্যাংকে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
বিএনপি নেতৃত্বের আশাবাদ: সব সমস্যার সমাধান হবে-বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান ,মনোনয়ন-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ চলছে। মিসেস জিয়া দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন এবং তারেক রহমানও শিগগির দেশে ফিরবেন বলে আমরা আশাবাদী।”
তবে মাঠপর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, নির্বাচনের সময় যত কাছে আসছে, দলীয় নেতৃত্ব এবং মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে স্পষ্ট বার্তা না পাওয়া গেলে বিভ্রান্তি আরও বাড়তে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি বর্তমানে যে তিনটি বড় সংকটের মুখে রয়েছে—তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা,খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার জটিলতা ,মনোনয়নকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
এসব ইস্যু দলটির সামগ্রিক প্রস্তুতিকে কঠিন করে তুলছে। শীর্ষ নেতৃত্ব দ্রুত সিদ্ধান্ত ও বার্তা না দিলে দলের ভেতরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা নির্বাচনী মাঠে আরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।





















