
মোঃ শাহজাহান বাশার
দীর্ঘ ২২ বছর পর খুলনায় এসে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের ভোট ও আল্লাহতালার রহমতে বিএনপি যদি আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়, তাহলে সর্বপ্রথম দায়িত্ব হবে দেশ পুনর্গঠন করা। তবে এই পুনর্গঠন কোনো একটি দল বা গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে নয়; বরং দল-মত, শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়েই নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে খুলনার খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের প্রভাতী স্কুল মাঠে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দীর্ঘদিন পর দলের শীর্ষ নেতাকে সরাসরি কাছে পেয়ে জনসভাস্থলে নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা যায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আবেগঘন পরিবেশ।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি কখনো ফাঁকা বুলি বা লোক দেখানো প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে না। বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কাজের মাধ্যমেই দেশ পরিচালনা করতে চায়। তিনি বলেন, “গত ১৫ থেকে ১৬ বছরে বিএনপি ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী খুন, গুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষকে গায়েবি মামলায় জড়িয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, এত দমন-পীড়নের পরও ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। “এটি প্রমাণ করে, এ দেশের মানুষ অন্যায়ের সঙ্গে আর কোনো আপস করবে না,” বলেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
প্রায় ২৬ মিনিটের বক্তব্যে তারেক রহমান অভিযোগ করেন, গত ১৬ বছর ধরে দেশের মানুষ তাদের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে জাতীয় ও স্থানীয়—সব ধরনের নির্বাচনে। “যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার চেষ্টা করেছে, তাদের অনেককেই রাতের অন্ধকারে তুলে নেওয়া হয়েছে, কেউ খুন হয়েছে, কেউ গুমের শিকার হয়েছে,” বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, “আজ সেই সময় এসেছে, যখন জনগণ তাদের হারানো অধিকার পুনরুদ্ধার করবে। আগামী ১২ তারিখ জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করবে।”
রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপির পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি অতীতেও দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। “আগামী দিনেও যদি জনগণের সমর্থনে সরকার গঠন করি, তাহলে সবার আগে দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করব। কিন্তু সেই পুনর্গঠন হবে সবাইকে নিয়ে—দল, মত বা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে,” বলেন তিনি।
তিনি বলেন, “যারা মানুষের মর্যাদা বোঝে না, আত্মসম্মানকে গুরুত্ব দেয় না—তাদের হাতে কখনোই একটি রাষ্ট্র নিরাপদ থাকতে পারে না।”
নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। “এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। দেশ পুনর্গঠন বা উন্নয়ন—কোনোটাই নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়,” বলেন তিনি।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার স্কুল থেকে কলেজ পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা চালু করেছিল, যাতে নারী সমাজ শিক্ষিত হয়ে স্বাবলম্বী হতে পারে এবং দেশের অগ্রগতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপির আয়োজিত এই জনসভায় সভাপতিত্ব করেন মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা। মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিনের সঞ্চালনায় জনসভায় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও খুলনা-৩ আসনের প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-২ আসনের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু, খুলনা-৪ আসনের প্রার্থী আজিজুল বারী হেলাল, খুলনা-৫ আসনের প্রার্থী আলী আসগর লবী, খুলনা-১ আসনের প্রার্থী আমীর এজাজ খান এবং খুলনা-৬ আসনের প্রার্থী এস এম মনিরুর হাসান বাপ্পী।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন আসনের বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা।
এর আগে সোমবার সকাল ১১টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মাধ্যমে জনসভার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
উল্লেখ্য, খুলনায় এটি তারেক রহমানের চতুর্থ সফর। সর্বশেষ ২০০৪ সালে তিনি খুলনা সফর করেছিলেন। দীর্ঘ দুই দশক পর তার আগমন খুলনার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।






















