
মোঃ শাহজাহান বাশার
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন রাজনীতির মাঠে হাঁটতে হাঁটতে আমি এক কঠিন সত্য উপলব্ধি করেছি—এখানে নির্বাচন অনেক সময় আর জনগণের মত প্রকাশের প্রক্রিয়া থাকে না; বরং তা পরিণত হয় ক্ষমতাবান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর দখলদারি ও হিংস্র প্রতিযোগিতায়। অর্থ, প্রভাব, প্রশাসনিক সংযোগ ও পেশিশক্তিকে হাতিয়ার করে একটি গোষ্ঠী নির্বাচনকে জনগণের অধিকার থেকে সরিয়ে নিজেদের আধিপত্য রক্ষার যুদ্ধে রূপ দেয়। এর ফলশ্রুতিতে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যায়, আর ভয় ও আতঙ্ক হয়ে ওঠে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রধান অস্ত্র।
গত পাঁচ মাস ধরে আমার প্রতিটি লেখা, বক্তব্য ও ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচারপত্র বিলির কেন্দ্রে ছিল একটি স্পষ্ট বার্তা—রাজনীতি মানুষের জন্য, কোনো দল বা ক্ষমতার বলয়ের জন্য নয়।
এই বিশ্বাস থেকেই গত **২২ ডিসেম্বর** আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করি। আমার ধারণা ছিল—জনগণ পাশে থাকলে দলীয় পরিচয় গৌণ হয়ে যাবে। প্রয়োজনে রাজনৈতিক সমঝোতার পথও খোলা থাকবে। কিন্তু নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গেই বাস্তবতা খুব দ্রুত এবং নির্মমভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়।
২৩ ডিসেম্বর রাতে একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমার ব্রাহ্মণপাড়ার বাসায় যৌথবাহিনীর তল্লাশি চালানো হয়। কাগজে-কলমে এটি একটি তল্লাশি হলেও বাস্তবে এটি ছিল একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা—*এই পথে আর এগোবে না।*
কুমিল্লা-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিতদের মধ্য থেকে ধানের শীষের বিপক্ষে একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড়ানোর সম্ভাবনা আগেই বিবেচনায় ছিল। চতুর্মুখী লড়াইয়ের বাস্তবতায় তারা জানত—আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকলে জনগণের ভোটে বিজয়ের সম্ভাবনা বাস্তব ও শক্তিশালী। অনেকেই প্রকাশ্যে বলেছেন, **২০২৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে** কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও আমি প্রায় **৩২ হাজার ভোট** পেয়েছিলাম। সেই অভিজ্ঞতাই কারও কারও জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়।
এই ভয় থেকেই শুরু হয় পরিকল্পিত আক্রমণ—আমার ব্যানার-বিলবোর্ড ছিঁড়ে ফেলা, ভাঙচুরের দৃশ্য লাইভ করে ছড়ানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং মোবাইল ফোনে অবিরাম হুমকি-ধমকি। এসব এখনো অব্যাহত।
আমি প্রায় **২৫ বছর ধরে** কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং–ব্রাহ্মণপাড়া) আসনে সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে সক্রিয়ভাবে মাঠে ছিলাম। সাবেক আইনমন্ত্রী মরহুম আবদুল মতিন খসরুর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তির বিপক্ষে দাঁড়ানোর সাহস খুব কম মানুষই দেখিয়েছে। এই রাজনৈতিক বাস্তবতাই আজ কারও কারও জন্য গভীর আতঙ্কের কারণ।
মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পর চাপ আরও বেড়ে যায়। এমন কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী নেই যারা অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করেনি, ব্যক্তিগতভাবে হুমকি দেয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে “আওয়ামী লীগের দোসর” তকমা লাগানোর অপচেষ্টা—যার উদ্দেশ্য একটাই, আমি যেন নিজেই নির্বাচন থেকে সরে আসি।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ কার্যত অসম্ভব* হয়ে পড়ে। মানুষ স্বাক্ষর দিতে গিয়ে প্রশ্ন করেছে—*আমাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কে দেবে? নাম-ঠিকানা প্রকাশ হলে আমরা কি ঝামেলায় পড়ব না?* একজন প্রার্থী নিজেই যখন নিরাপত্তাহীন, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দায় নেওয়ার নৈতিক শক্তি কোথায়?
এর ওপর রয়েছে আরেকটি কাঠামোগত বৈষম্য—মনোনয়নপত্র কেনার আগে এক শতাংশ ভোটারের নাম ও ভোটার নম্বর সংগ্রহের কোনো সুযোগ নেই। এই স্বল্প সময়ে সেই তথ্য জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। এর ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়। সময়ের অভাব ও ভয়ের চাপে অনেকেই নির্বাচন থেকেই সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন—যা আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে।
এই বাস্তবতার আলোকে আমি নির্বাচনের তফসিল পুনর্বিবেচনা করে নতুন তারিখ ঘোষণার দাবি* জানাচ্ছি।
এই কারণেই আমি নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটি কোনো পলায়ন নয়। এটি এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের মতো ভীতিনির্ভর ও অন্যায্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রতিবাদ*। এমন এক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—যেখানে জনগণের ভোট দেওয়ার আগেই ভয় দেখিয়ে মাঠ খালি করা হয়।
গণতন্ত্রের ছদ্মাবেশে কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে আমি আপোষ করিনি বলেই আজও কোনো দলের সদস্য হইনি। আমি বিশ্বাস করি, সময় আসবে—যখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া অপরাধ হবে না। ভয় নয়, জনগণের ভালোবাসাই হবে রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি।
সেই দিনের আশায়, আমি আজও মাথা উঁচু করেই দাঁড়িয়ে আছি।

Reporter Name 




















