০৯:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সুন্নি ভোট এক বাক্সে আনার কৌশলে মাঠে ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’

চট্টগ্রামের ১৬ আসনের মধ্যে ১৩টিতে সমন্বিত প্রার্থী

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:১১:১৮ পূর্বাহ্ন, রোববার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
  • ৩০৬১ বার পঠিত হয়েছে

মোঃ শাহজাহান বাশার

সুফি, তরিকত ও খানকাহপন্থিদের ঐতিহ্যবাহী জনপদ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামকে বহুদিন ধরেই ‘বারো আউলিয়ার ভূমি’ বলা হয়। অসংখ্য অলি-আউলিয়া, পীর-মাশায়েখ ও বুজুর্গের মাজারে ঘেরা এই অঞ্চল বরাবরই সুন্নি মতাদর্শের শক্ত ঘাঁটি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এবার এই ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বাস্তবতাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার কৌশল নিয়েছে সুন্নিপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো।

এই লক্ষ্য সামনে রেখে তিনটি সুন্নি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’। জোটের অংশীদার দলগুলো হলো— বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মোমবাতি), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ (চেয়ার) এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি-বিএসপি (একতারা)। গত ৩০ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটের ঘোষণা দেওয়া হয়।

জোট সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৩টিতে প্রার্থী দিয়েছে বৃহত্তর সুন্নি জোট। এর মধ্যে ছয় থেকে সাতটি আসনকে তারা বিশেষভাবে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছে। বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের বিপরীতে সুন্নি মতাদর্শী ভোটকে একত্রিত করে চমক দেখাতে চান জোটের নীতিনির্ধারকেরা।

জোটের কৌশলের অংশ হিসেবে এবার অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির, উচ্চশিক্ষিত ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তালিকায় রয়েছেন মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জনকারী আলেম, প্রভাবশালী পীর ও জনপ্রিয় সামাজিক ব্যক্তিত্বরা।

এবারের নির্বাচনে জোটভুক্ত তিন দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা প্রার্থী হননি। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এম এ মতিন, মহাসচিব স. উ. ম. আবদুস সামাদ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মহাসচিব জয়নুল আবেদিন জুবাইর এবং বিএসপির মহাসচিব শাহ মোহাম্মদ আসলাম হোসাইন। অতীতে তারা একাধিকবার নির্বাচনে অংশ নিলেও এবার কৌশলগত কারণে নতুন ও তরুণ মুখকে সামনে এনেছেন।

নেতাদের দাবি, নতুন প্রজন্মকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে সুন্নি রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব তৈরি হয়।

জোটের দেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের, পাঁচজন ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের এবং দুইজন বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির। তারা হলেন—

  • চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি): সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমেদ মাইজভান্ডারী

  • চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড): মো. শহীদুল ইসলাম চৌধুরী

  • চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী): মাওলানা রফিক উদ্দিন

  • চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান): অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইলিয়াস নুরী

  • চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া): অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন

  • চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও): মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ হাসান আজহারী

  • চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া): মাওলানা ওয়াহেদ মুরাদ

  • চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-হালিশহর): মাওলানা আবু তাহের

  • চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা): মাওলানা মো. আবু তাহের

  • চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া): পীরজাদা সৈয়দ এয়ার মোহাম্মদ পেয়ারু

  • চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী): সৈয়দ মুহাম্মদ শাহজাহান

  • চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ): মাওলানা মো. সোলায়মান ফারুকী

  • চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী): মাওলানা আবদুল মালেক

জোট নেতাদের মতে, চট্টগ্রাম-৬, ৭, ৮, ১২, ১৩ ও ১৪ আসনে তাদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্ত। পাশাপাশি চট্টগ্রাম-২ আসনকেও সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএসপিপ্রধান সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমেদ মাইজভান্ডারী।জোট গঠনের শুরুতে আসন বণ্টন নিয়ে কিছুটা মতভেদ থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা মীমাংসা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-৪ ও চট্টগ্রাম-৫ আসনে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করবে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-৪ আসন ছেড়ে দেওয়া হবে বিএসপিকে এবং চট্টগ্রাম-৫ আসন ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশকে।

ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আখতারী বলেন,
“চট্টগ্রাম সুন্নি মতাদর্শীদের জন্য অত্যন্ত উর্বর একটি এলাকা। অতীতে বিভক্তির কারণে আমরা সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারিনি। এবার তিন দলের ঐক্যের ফলে নির্বাচনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান মাওলানা এম এ মতিন বলেন,
“সুন্নি, সুফি ও তরিকাপন্থি দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনতেই বৃহত্তর সুন্নি জোট। চট্টগ্রামে সুন্নি মতাদর্শীদের বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে। এবার বিভাজন না থাকায় সেই ভোট এক বাক্সে আসবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।”

তিনি আরও বলেন,
“১৬টি আসনের মধ্যে ১৩টিতে আমরা প্রার্থী দিয়েছি। ছয়-সাতটি আসনে বিএনপি-জামায়াত জোটের বিপরীতে আমরা শক্ত অবস্থানে আছি। সুন্নিদের ভোট একত্রিত হলে বিজয় সম্ভব।”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

তদন্ত ছাড়া সাংবাদিক গ্রেফতার নয়: বিএমএসএফ চেয়ারম্যান আহমেদ আবু জাফর

সুন্নি ভোট এক বাক্সে আনার কৌশলে মাঠে ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’

চট্টগ্রামের ১৬ আসনের মধ্যে ১৩টিতে সমন্বিত প্রার্থী

Update Time : ১০:১১:১৮ পূর্বাহ্ন, রোববার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬

মোঃ শাহজাহান বাশার

সুফি, তরিকত ও খানকাহপন্থিদের ঐতিহ্যবাহী জনপদ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামকে বহুদিন ধরেই ‘বারো আউলিয়ার ভূমি’ বলা হয়। অসংখ্য অলি-আউলিয়া, পীর-মাশায়েখ ও বুজুর্গের মাজারে ঘেরা এই অঞ্চল বরাবরই সুন্নি মতাদর্শের শক্ত ঘাঁটি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এবার এই ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বাস্তবতাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার কৌশল নিয়েছে সুন্নিপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো।

এই লক্ষ্য সামনে রেখে তিনটি সুন্নি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’। জোটের অংশীদার দলগুলো হলো— বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মোমবাতি), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ (চেয়ার) এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি-বিএসপি (একতারা)। গত ৩০ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটের ঘোষণা দেওয়া হয়।

জোট সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৩টিতে প্রার্থী দিয়েছে বৃহত্তর সুন্নি জোট। এর মধ্যে ছয় থেকে সাতটি আসনকে তারা বিশেষভাবে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছে। বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের বিপরীতে সুন্নি মতাদর্শী ভোটকে একত্রিত করে চমক দেখাতে চান জোটের নীতিনির্ধারকেরা।

জোটের কৌশলের অংশ হিসেবে এবার অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির, উচ্চশিক্ষিত ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তালিকায় রয়েছেন মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জনকারী আলেম, প্রভাবশালী পীর ও জনপ্রিয় সামাজিক ব্যক্তিত্বরা।

এবারের নির্বাচনে জোটভুক্ত তিন দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা প্রার্থী হননি। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এম এ মতিন, মহাসচিব স. উ. ম. আবদুস সামাদ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মহাসচিব জয়নুল আবেদিন জুবাইর এবং বিএসপির মহাসচিব শাহ মোহাম্মদ আসলাম হোসাইন। অতীতে তারা একাধিকবার নির্বাচনে অংশ নিলেও এবার কৌশলগত কারণে নতুন ও তরুণ মুখকে সামনে এনেছেন।

নেতাদের দাবি, নতুন প্রজন্মকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে সুন্নি রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব তৈরি হয়।

জোটের দেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের, পাঁচজন ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের এবং দুইজন বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির। তারা হলেন—

  • চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি): সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমেদ মাইজভান্ডারী

  • চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড): মো. শহীদুল ইসলাম চৌধুরী

  • চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী): মাওলানা রফিক উদ্দিন

  • চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান): অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইলিয়াস নুরী

  • চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া): অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন

  • চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও): মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ হাসান আজহারী

  • চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া): মাওলানা ওয়াহেদ মুরাদ

  • চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-হালিশহর): মাওলানা আবু তাহের

  • চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা): মাওলানা মো. আবু তাহের

  • চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া): পীরজাদা সৈয়দ এয়ার মোহাম্মদ পেয়ারু

  • চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী): সৈয়দ মুহাম্মদ শাহজাহান

  • চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ): মাওলানা মো. সোলায়মান ফারুকী

  • চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী): মাওলানা আবদুল মালেক

জোট নেতাদের মতে, চট্টগ্রাম-৬, ৭, ৮, ১২, ১৩ ও ১৪ আসনে তাদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্ত। পাশাপাশি চট্টগ্রাম-২ আসনকেও সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএসপিপ্রধান সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমেদ মাইজভান্ডারী।জোট গঠনের শুরুতে আসন বণ্টন নিয়ে কিছুটা মতভেদ থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা মীমাংসা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-৪ ও চট্টগ্রাম-৫ আসনে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করবে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-৪ আসন ছেড়ে দেওয়া হবে বিএসপিকে এবং চট্টগ্রাম-৫ আসন ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশকে।

ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আখতারী বলেন,
“চট্টগ্রাম সুন্নি মতাদর্শীদের জন্য অত্যন্ত উর্বর একটি এলাকা। অতীতে বিভক্তির কারণে আমরা সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারিনি। এবার তিন দলের ঐক্যের ফলে নির্বাচনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান মাওলানা এম এ মতিন বলেন,
“সুন্নি, সুফি ও তরিকাপন্থি দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনতেই বৃহত্তর সুন্নি জোট। চট্টগ্রামে সুন্নি মতাদর্শীদের বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে। এবার বিভাজন না থাকায় সেই ভোট এক বাক্সে আসবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।”

তিনি আরও বলেন,
“১৬টি আসনের মধ্যে ১৩টিতে আমরা প্রার্থী দিয়েছি। ছয়-সাতটি আসনে বিএনপি-জামায়াত জোটের বিপরীতে আমরা শক্ত অবস্থানে আছি। সুন্নিদের ভোট একত্রিত হলে বিজয় সম্ভব।”