০৩:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শ্রদ্ধা ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় বেগম খালেদা জিয়া

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:৩৯:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি ২০২৬
  • ৩১২০ বার পঠিত হয়েছে

মোঃ শাহজাহান বাশার

দলমতনির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষ এবং রাজনৈতিক নেতাদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বিএনপি চেয়ারপারসন, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্র রক্ষায় তাঁর অবদানকে সম্মান জানাতে পুরো দেশ হৃদয় নিংড়ানো শোকের সঙ্গে বিদায় জানালো।

জীবদ্দশায় দেশনেত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, “এই দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা। বিদেশে আমার আর কোনো ঠিকানা নেই। আমি কোথাও যাব না।” অবশেষে নিজের প্রিয় দেশের মাটিতেই তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ নিদ্রায় শায়িত হলেন, প্রিয় স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি বীর-উত্তম জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে।

বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, তারেক রহমান নিজের হাতে মমতাময়ী মায়ের লাশ কবরস্থাপন করেন। কবরস্থাপনের সময় পুষ্পমাল্য অর্পণসহ শ্রদ্ধা জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান এবং দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেয়া গার্ড অব অনার মহীয়সী নেত্রীকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর এক অনন্য উদাহরণ হয়ে রইল।

ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর রাস্তাগুলো তখন সমগ্র জাতির শোকের এক সমুদ্রের মতো ভরে ওঠে। কয়েক দিনের কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার পর হঠাৎ উজ্জ্বল সূর্যের আলো বিখ্যাত স্থানটিতে ছড়িয়ে পড়ে, যেন দেশের মানুষও এই মহীয়সী নেত্রীর বিদায়কে আলোকিত করতে চেয়েছিল।

দুপুরে ৩টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে চার তাকবিরের জানাজার নামাজ শুরু হয়। খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক নামাজ পরিচালনা করেন। জানাজার পরে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে লাশবাহী গাড়িতে করে দেশনেত্রীর লাশ জিয়া উদ্যানে নিয়ে যাওয়া হয়। বিকাল পৌনে ৫টায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে সমাহিত করা হয়।

তারেক রহমান ইসলামী রীতি অনুযায়ী কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে মায়ের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান এবং সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, “আল্লাহর কাছে দোয়া করি যেন তিনি আমার মাকে জান্নাতের উচু স্থান দান করেন।”

জানাজায় উপস্থিত মানুষ শুধুই রাজনৈতিক সমর্থক নয়; এখানে ছিল দেশের প্রতিটি শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের নাগরিক। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, আগারগাঁও, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ধানমন্ডি, কলাবাগান—প্রায় ঢাকা মহানগরী পুরোপুরি শোকের ছায়ায় ঢেকে গেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ রাজধানীতে এসে অংশ নিয়েছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল সর্বোচ্চ: বিজিবি, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, আনসার ও ভিডিপিসহ সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত পাহারা দেয়। এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে সংসদ ভবন, জিয়া উদ্যান এবং জানাজাস্থল জুড়ে নিরাপত্তা চৌকশ ছিল।

জানাজার সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মায়ের পাশে বসে কোরআন তিলাওয়াত করেন।
দেশনেত্রীর জানাজার নামাজ সম্পন্ন হয় প্রায় কোটি মানুষের উপস্থিতিতে। দেশের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশ করেছেন। দেশের বাইরে থেকেও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানসহ ৩২টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন।

শোকবার্তা পৌঁছে দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ও পাকিস্তানের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক। দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও উপস্থিত থেকে সমবেদনা জানান।

বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ সময় কেটেছে এভারকেয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যায়। এক মাসের বেশি তিনি সিসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। করোনারি সমস্যা, লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসসহ নানান জটিলতার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দিন তিনি সংগ্রাম করেছেন। ২৩ নভেম্বর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ প্রচেষ্টার পর তিনি পরপারে চলে যান।

বাংলাদেশ রাজনীতির এক আপসহীন নেত্রী, গণতন্ত্রের অটল প্রহরী, এবং দেশের মানুষের হৃদয়ে চিরমর্যাদার স্থান পাওয়া এই মহীয়সী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও মৃত্যু দুইয়েই দেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

জামায়াতের মিথ্যাচার জনগণ ক্ষমা করবে না: মির্জা ফখরুল

শ্রদ্ধা ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় বেগম খালেদা জিয়া

Update Time : ০১:৩৯:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি ২০২৬

মোঃ শাহজাহান বাশার

দলমতনির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষ এবং রাজনৈতিক নেতাদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বিএনপি চেয়ারপারসন, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্র রক্ষায় তাঁর অবদানকে সম্মান জানাতে পুরো দেশ হৃদয় নিংড়ানো শোকের সঙ্গে বিদায় জানালো।

জীবদ্দশায় দেশনেত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, “এই দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা। বিদেশে আমার আর কোনো ঠিকানা নেই। আমি কোথাও যাব না।” অবশেষে নিজের প্রিয় দেশের মাটিতেই তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ নিদ্রায় শায়িত হলেন, প্রিয় স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি বীর-উত্তম জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে।

বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, তারেক রহমান নিজের হাতে মমতাময়ী মায়ের লাশ কবরস্থাপন করেন। কবরস্থাপনের সময় পুষ্পমাল্য অর্পণসহ শ্রদ্ধা জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান এবং দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেয়া গার্ড অব অনার মহীয়সী নেত্রীকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর এক অনন্য উদাহরণ হয়ে রইল।

ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর রাস্তাগুলো তখন সমগ্র জাতির শোকের এক সমুদ্রের মতো ভরে ওঠে। কয়েক দিনের কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার পর হঠাৎ উজ্জ্বল সূর্যের আলো বিখ্যাত স্থানটিতে ছড়িয়ে পড়ে, যেন দেশের মানুষও এই মহীয়সী নেত্রীর বিদায়কে আলোকিত করতে চেয়েছিল।

দুপুরে ৩টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে চার তাকবিরের জানাজার নামাজ শুরু হয়। খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক নামাজ পরিচালনা করেন। জানাজার পরে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে লাশবাহী গাড়িতে করে দেশনেত্রীর লাশ জিয়া উদ্যানে নিয়ে যাওয়া হয়। বিকাল পৌনে ৫টায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে সমাহিত করা হয়।

তারেক রহমান ইসলামী রীতি অনুযায়ী কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে মায়ের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান এবং সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, “আল্লাহর কাছে দোয়া করি যেন তিনি আমার মাকে জান্নাতের উচু স্থান দান করেন।”

জানাজায় উপস্থিত মানুষ শুধুই রাজনৈতিক সমর্থক নয়; এখানে ছিল দেশের প্রতিটি শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের নাগরিক। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, আগারগাঁও, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ধানমন্ডি, কলাবাগান—প্রায় ঢাকা মহানগরী পুরোপুরি শোকের ছায়ায় ঢেকে গেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ রাজধানীতে এসে অংশ নিয়েছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল সর্বোচ্চ: বিজিবি, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, আনসার ও ভিডিপিসহ সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত পাহারা দেয়। এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে সংসদ ভবন, জিয়া উদ্যান এবং জানাজাস্থল জুড়ে নিরাপত্তা চৌকশ ছিল।

জানাজার সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মায়ের পাশে বসে কোরআন তিলাওয়াত করেন।
দেশনেত্রীর জানাজার নামাজ সম্পন্ন হয় প্রায় কোটি মানুষের উপস্থিতিতে। দেশের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশ করেছেন। দেশের বাইরে থেকেও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানসহ ৩২টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন।

শোকবার্তা পৌঁছে দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ও পাকিস্তানের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক। দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও উপস্থিত থেকে সমবেদনা জানান।

বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ সময় কেটেছে এভারকেয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যায়। এক মাসের বেশি তিনি সিসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। করোনারি সমস্যা, লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসসহ নানান জটিলতার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দিন তিনি সংগ্রাম করেছেন। ২৩ নভেম্বর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ প্রচেষ্টার পর তিনি পরপারে চলে যান।

বাংলাদেশ রাজনীতির এক আপসহীন নেত্রী, গণতন্ত্রের অটল প্রহরী, এবং দেশের মানুষের হৃদয়ে চিরমর্যাদার স্থান পাওয়া এই মহীয়সী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও মৃত্যু দুইয়েই দেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।