
আবুল হোসেন বাবলুঃ
রংপুরে বিষাক্ত মদ পান করিয়ে হত্যা মামলার দুইজন আসামি এবং পল্লী বিদ্যুতের এক কর্মীকে কুপিয়ে হত্যার পর মাটিচাপা দিয়ে লাশ গুম করার ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি সহ র্যাবের পৃথক অভিযানে ৩ জন পলাতক আসামী গ্রেফতার।
বাদী জাহিদুল ইসলামের দায়েরকৃত এজাহারের বরাত দিয়ে জানানো হয়, ধৃত আসামিদের অবৈধ মাদক বিক্রি করাকে কেন্দ্র করে ভিকটিমের সাথে শত্রুতার সৃষ্টি হয়। এরই জের ধরে গত ৩০ মে ২০২৬ রাত সাড়ে এগারোটার দিকে ধৃত আসামি মোঃ রফিকুল ইসলাম কৌশলে তার আম ও মালটা বাগানে ভিকটিম এবং তার তিন বন্ধুকে নিয়ে গিয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ বিষাক্ত মদপান করান। পরে ভিকটিমসহ অন্যান্যরা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গিয়ে সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাদী ভিকটিমের ভাগিনা ও পরিবারের সদস্যরা ভিকটিম সাজু মিয়াকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (রমেক) এ ভর্তি করান। পরবর্তীতে গত ০১ জুন দুপুর সোয়া দুইটায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভিকটিম সাজু মিয়া (৫৫) মৃত্যুবরণ করেন।
উল্লেখ্য যে, এই ঘটনায় ভিকটিমের সাথে থাকা তার তিন বন্ধুও বিভিন্ন সময় মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে গত ০২ জুন ভিকটিমের ভাগিনা বাদী হয়ে রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানায় আসামিদের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৩০২/৩২৮/৩৪ ধারায় বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে আঘাত প্রদান করে হত্যার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং-০৪।
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আসামিদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি র্যাব গোয়েন্দা নজরদারি ও ছায়া তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব-১৩ সিপিএসসি ক্যাম্প রংপুর ও সিপিসি-২ র্যাব-০৪ সাভার ঢাকা ক্যাম্পের একটি যৌথ আভিযানিক দল ০৭ জুন সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানাধীন নিরিবিলি এলাকায় অভিযান চালিয়ে উল্লেখিত আলোচিত হত্যা মামলার পলাতক প্রধান আসামীসহ ২ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। গ্রেফতারকৃতরা রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানাধীন খোর্দ্দ কোমরপুর গ্রামের সোলেমান মিয়ার ছেলে রফিকুল ইসলাম (৪৫) এবং তার ছোট ভাই শফিকুল ইসলাম (৪০)।
একইদিন অপর একটি অভিযানে রংপুরের তারাগঞ্জে পল্লী বিদ্যুতের এক কর্মীকে কুপিয়ে হত্যার পর মাটিচাপা দিয়ে লাশ গুম করার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার প্রধান আসামী ঢাকা থেকে গ্রেফতার। বাদী মোছাঃ জান্নাতি বেগম (৩২) এর দায়েরকৃত এজাহারের বরাত দিয়ে জানানো হয়, বাদীর স্বামী ভিকটিম মঞ্জুরুল হোসেন (৪৫) একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। যার সুবাদে ভিকটিম পল্লী বিদ্যুতের ঠিকাদারের অধীনে কাজ করতেন। সময় সুযোগ পেলে বিভিন্ন লোকের বাড়ীতে ও অফিসে ইলেকট্রিক কাজ করতেন। সেই মোতাবেক গত ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ সকাল আনুমানিক ১০ টায় কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ী হতে বের হয়ে যায়। সারাদিন গত হওয়ার পরও মঞ্জুরুল বাড়ীতে ফিরে না আসলে বাদী তার স্বামী মঞ্জুরুলকে ফোনের মাধ্যমে কল করলে মঞ্জুরুলের ফোন বন্ধ পান। এরপর বাদী তার প্রতিবেশী দেবর আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে স্বামী মঞ্জুরুলকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে কোথাও না পেয়ে পর দিন ২৫ ফেব্রুয়ারী বাদী তারাগঞ্জ থানায় একটি নিখোঁজ জিডি করেন। যার জিডি নং ১০৭৬।
পরবর্তীতে জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ তারাগঞ্জ থানা পুলিশ ভিকটিমকে খোঁজাখুঁজি করাকালে ২৬ ফেব্রুয়ারী বিকেলে লোকমুখে সংবাদ পেয়ে তারাগঞ্জ থানাধীন ২নং কুর্শা ইউনিয়নের রামপুরা মৌজাস্থ জনৈক শাহাদত হোসেন সুজন মিয়ার আলু ক্ষেতের জমির আইলে রক্ত এবং জমির দক্ষিণ-পূর্ব কোণে মাটি সামান্য আলগা ও ভেজা দেখে কোদাল দিয়ে মাটি খুড়ে মঞ্জুরুলের মৃত দেহ দেখতে পান। বাদী সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিহতের মুখ দেখে তার স্বামীকে সনাক্ত করেন। লাশের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত চিহ্ন ছিলো। তারাগঞ্জ থানা পুলিশ মরদেহের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে পোস্টমর্টেম করার জন্য মর্গে প্রেরণ করে। এ ঘটনায় ভিকটিমের স্ত্রী বাদী হয়ে ২৭ ফেব্রুয়ারী অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে ধারা- ৩০২/২০১/৩৭৯, পেনাল কোড- ১৮৬০ মূলে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং-০৫।
পরবর্তীতে তদন্তকালে জানা যায় যে, ভিকটিম এবং ধৃত আসামি ও তার সহযোগী আসামিদের মধ্যে পাওনা টাকা লেনদেনের ফলে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে ২৪/০২/২০২৬ সন্ধ্যায় ধৃত আসামি ও তার সহযোগীরা মিলে ভিকটিমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও গলাকেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ গুম করতে আলুর জমিতে মাটিচাপা দিয়ে রাখে। পরে আসামিরা ভিকটিমের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি নিয়ে পালিয়ে যায়। চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার আসামি গ্রেফতারে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি র্যাব গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু করে।
এরই ধারাবাহিকতায় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব-১৩ সিপিএসসি রংপুর এবং সিপিসি-২ র্যাব-৪ সাভার ঢাকা ক্যাম্পের একটি যৌথ আভিযানিক দল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ঢাকা জেলার সাভার থানাধীন বৌ বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে উল্লেখিত মামলার পলাতক প্রধান আসামীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেফতারকৃত আসামী রংপুর জেলার তারাগঞ্জ থানার অন্তর্ভুক্ত দক্ষিণ ঘনিরামপুর ঝাকুয়াপাতা গ্রামের মৃত খাদেমুল ইসলামের ছেলে মহাব্বত আলী (৩১)। পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ধৃত আসামিদের সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।



















