
মোঃ শাহজাহান বাশার
নির্বাচনী প্রচার শেষ হতে আর মাত্র দুই দিন বাকি। এই সময়টিতে বাংলাদেশের রাজনীতি এসে দাঁড়িয়েছে প্রচার-প্রচারণার ‘অন্তিম সমীকরণে’। স্লোগান, মিছিল, সমাবেশ আর প্রতিশ্রুতিতে মুখর রাজপথে রাজনৈতিক দলগুলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জনসমর্থনের পাল্লা নিজেদের দিকে ভারী করতে শেষ মুহূর্তের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। এই উত্তাপ গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অনুষঙ্গ হলেও, তা যেন অসহিষ্ণুতা, ভীতি কিংবা বিশৃঙ্খলায় রূপ না নেয়—এই প্রত্যাশাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে সব ধরনের নির্বাচনী প্রচার শেষ করতে হবে। ফলে শেষ দুই দিন পরিণত হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতার মঞ্চে। রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বড় বড় সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। বিএনপি ঢাকায় শেষ শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামি ঢাকা-১৫ আসনে গণমিছিল ও গণসংযোগের মাধ্যমে প্রচারের ইতি টানতে পারে। সমর্থকদের উজ্জীবিত করাই এসব কর্মসূচির লক্ষ্য হলেও, একই সঙ্গে এগুলো রাজনৈতিক সংযমের সীমারেখাকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলছে।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, প্রচারণায় আগ্রাসী ভাষা ও অসহিষ্ণু আচরণ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং শেষ মুহূর্তে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—নির্বাচনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় শুরু নয়, বরং শেষপ্রান্ত, যখন আবেগ চরমে ওঠে এবং পরাজয়ের আশঙ্কা কিছু পক্ষকে উসকানিমূলক পথে ঠেলে দেয়। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রযন্ত্রের সতর্ক অবস্থান অবশ্যই ইতিবাচক। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীসহ বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েন, অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় আস্থার বার্তা দেয়।
তবে কেবল নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা যায় না। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণ এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিপূর্ণ প্রচার শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্বও। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মানদণ্ড কে কত জোরে স্লোগান দিতে পারে তা নয়, বরং কে কত দায়িত্বশীলভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে—সেটিই আসল।
এবারের নির্বাচনের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অপতথ্য ও ভুয়া সংবাদের বিস্তার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অপপ্রচারকে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পোস্টাল ব্যালট, আগাম ফল ঘোষণার গুজব কিংবা ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তিকর দাবি ইতোমধ্যে অনলাইনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অপতথ্য মোকাবিলায় কমিশনের সাইবার মনিটরিং কার্যক্রম প্রশংসনীয় হলেও, নাগরিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। যাচাই ছাড়া শেয়ার করা মানেই অজান্তেই অস্থিরতার অংশ হয়ে ওঠা।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিও এই নির্বাচনকে বাড়তি গুরুত্বের জায়গায় নিয়ে গেছে। ফলে এই নির্বাচন কেবল ফলাফলের মাধ্যমে নয়, বরং যে পরিবেশে তা অনুষ্ঠিত হবে—সেই পরিবেশ দিয়েই মূল্যায়িত হবে। শান্তিপূর্ণ প্রচার, স্বচ্ছ ভোটগ্রহণ এবং বিশ্বাসযোগ্য গণনাই পারে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে দৃঢ় করতে।
সবশেষে বলা যায়, ভোটের আগের এই শেষ দুই দিন হওয়া উচিত রাজনৈতিক পছন্দের উৎসব, সংঘাতের মহড়া নয়। নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও সাধারণ নাগরিক—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব হলো নিশ্চিত করা যে, এই নির্বাচনের ‘অন্তিম সমীকরণ’ মিটবে বিশৃঙ্খলা দিয়ে নয়, বরং অবাধভাবে প্রদত্ত ও সঠিকভাবে গণনা করা ভোটের মাধ্যমে। শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের প্রমাণ কে জিতল তাতে নয়, বরং প্রতিযোগিতাটি কীভাবে অনুষ্ঠিত হলো—সেখানেই।
লেখক
মোঃ শাহজাহান বাশার
সাংবাদিক ও কলামিস্ট

















