১১:০২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কবিরাজ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা ৮ বছর পর গ্রেফতার

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৮:২৬:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • ৩০৫১ বার পঠিত হয়েছে

মোঃ শান্ত খান,
সাভার উপজেলা প্রতিনিধিঃ

পরকীয়ার সম্পর্কের জেরে কবিরাজ মফিজুর রহমান @ মফিজ (৪০) কে পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর লাশ ১০ টুকরা করে গুম করার বহুল আলোচিত মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামী মোছাঃ মাকসুদা আক্তার লাকি (৩৯) @ হাসিনাকে দীর্ঘ আট বছর পলাতক থাকার পর গ্রেফতার করেছে সাভার মডেল থানা পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সাভারের হেমায়েতপুর বাগবাড়ি এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সাভার মডেল থানার ওসি আরমান আলীর নির্দেশনায় পরিচালিত এই অভিযানে ওয়ারেন্ট অফিসার এসআই আশরাফুল ইসলাম, এসআই সাখাওয়াত ইমতিয়াজ ও এসআই মতিউর রহমান ফোর্সসহ অংশ নেন। গ্রেপ্তারকৃত লাকি সাভার উপজেলার তেঁতুলঝরা ইউনিয়নের হেমায়েতপুর যাদুরচর এলাকার আলী আহমেদের মেয়ে।

মামলার নথি ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জ থানাধীন তারানগর ইউনিয়নের বেউতা গণকবরস্থানের পাশের একটি ডোবা থেকে দুই হাত, দুই পা ও মাথাবিহীন একটি মরদেহ উদ্ধার করে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ। তৎকালীন এসআই মেহেদী হাসান বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করলে তদন্তে নেমে পুলিশ মরদেহটির পরিচয় শনাক্ত করে জানতে পারে, তিনি সাভার উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়নের কাইসারচর ডুমরাকান্দা এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ কবিরাজ।

এরপর রহস্য উদঘাটনে তদন্ত শুরু হলে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। প্রবাসী স্বামী মালয়েশিয়ায় থাকায় সন্তান লাভের আশায় চিকিৎসার জন্য মফিজ কবিরাজের শরণাপন্ন হন হাসিনা। চিকিৎসার সূত্র ধরেই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে তা প্রেম ও দৈহিক সম্পর্কে রূপ নেয়। কিন্তু স্বামী দেশে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হলে লাকি সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইলে মফিজ নানাভাবে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেন এবং কবিরাজি ক্ষমতার কথা বলে স্বামী ও সন্তানের ক্ষতির ভয় দেখান বলে অভিযোগ ওঠে। এতে মানসিকভাবে আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন লাকি। পরে তিনি দেবর সালাউদ্দিন ও সহযোগী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা করে মফিজকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ‘থার্টি ফার্স্ট’ উদযাপনের কথা বলে মফিজকে বাসায় ডেকে আনা হয়। তাকে চা ও গরুর মাংসের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। এরপর ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে  তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর নির্মমভাবে লাশের মাথা, হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে টুকরা টুকরা করা হয়; মাথা কেরানীগঞ্জের নিমতলী ব্রিজের পাশে এবং দেহের অন্যান্য অংশ বেউতা এলাকার গণকবরস্থানের পাশের ডোবায় ফেলে দেয়, যাতে পরিচয় গোপন থাকে।

ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে লাকি, সালাউদ্দিন ও নজরুল ইসলামকে গ্রেফতার করে এবং তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হয়ে আত্মগোপনে চলে যায় আসামীরা। মামলার বিচার শেষে আদালত তিনজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। এর মধ্যে নজরুল ইসলাম মারা যায়, সালাউদ্দিন পাসপোর্টে নাম পরিবর্তন করে মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যায় এবং লাকি নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘হাসিনা’ পরিচয়ে ইতালি প্রবাসী হন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক ভেবে সম্প্রতি দেশে ফিরে পুনরায় বিয়ে করে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় আত্মগোপনে ছিলেন তিনি।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে পারেননি। দীর্ঘদিন ধরে পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের তালিকা ধরে সাভার মডেল থানা পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন অনুসন্ধানের মাধ্যমে তার অবস্থান নিশ্চিত করে এবং পরিকল্পিত অভিযানে তাকে গ্রেফতার করে। পুলিশ বলছে, পুরোনো ও আলোচিত মামলাগুলোর আসামীদেরও আইনের আওতায় আনতে তারা ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে।

এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরমান আলী বলেন, “মফিজুর রহমান হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামী দীর্ঘদিন পলাতক ছিল। গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আসামী পরিচয় বদলালেও আইনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই।” দীর্ঘ আট বছর পর নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের মূল আসামী গ্রেফতার হওয়ায় এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে। পুলিশের এই সাফল্য পেশাদারিত্ব ও দৃঢ়তারই আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

রংপুর রিপোর্টার্স ইউনিটির উদ্যোগে মৌসুমি ফল উৎসব অনুষ্ঠিত

কবিরাজ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা ৮ বছর পর গ্রেফতার

Update Time : ০৮:২৬:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মোঃ শান্ত খান,
সাভার উপজেলা প্রতিনিধিঃ

পরকীয়ার সম্পর্কের জেরে কবিরাজ মফিজুর রহমান @ মফিজ (৪০) কে পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর লাশ ১০ টুকরা করে গুম করার বহুল আলোচিত মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামী মোছাঃ মাকসুদা আক্তার লাকি (৩৯) @ হাসিনাকে দীর্ঘ আট বছর পলাতক থাকার পর গ্রেফতার করেছে সাভার মডেল থানা পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সাভারের হেমায়েতপুর বাগবাড়ি এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সাভার মডেল থানার ওসি আরমান আলীর নির্দেশনায় পরিচালিত এই অভিযানে ওয়ারেন্ট অফিসার এসআই আশরাফুল ইসলাম, এসআই সাখাওয়াত ইমতিয়াজ ও এসআই মতিউর রহমান ফোর্সসহ অংশ নেন। গ্রেপ্তারকৃত লাকি সাভার উপজেলার তেঁতুলঝরা ইউনিয়নের হেমায়েতপুর যাদুরচর এলাকার আলী আহমেদের মেয়ে।

মামলার নথি ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জ থানাধীন তারানগর ইউনিয়নের বেউতা গণকবরস্থানের পাশের একটি ডোবা থেকে দুই হাত, দুই পা ও মাথাবিহীন একটি মরদেহ উদ্ধার করে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ। তৎকালীন এসআই মেহেদী হাসান বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করলে তদন্তে নেমে পুলিশ মরদেহটির পরিচয় শনাক্ত করে জানতে পারে, তিনি সাভার উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়নের কাইসারচর ডুমরাকান্দা এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ কবিরাজ।

এরপর রহস্য উদঘাটনে তদন্ত শুরু হলে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। প্রবাসী স্বামী মালয়েশিয়ায় থাকায় সন্তান লাভের আশায় চিকিৎসার জন্য মফিজ কবিরাজের শরণাপন্ন হন হাসিনা। চিকিৎসার সূত্র ধরেই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে তা প্রেম ও দৈহিক সম্পর্কে রূপ নেয়। কিন্তু স্বামী দেশে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হলে লাকি সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইলে মফিজ নানাভাবে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেন এবং কবিরাজি ক্ষমতার কথা বলে স্বামী ও সন্তানের ক্ষতির ভয় দেখান বলে অভিযোগ ওঠে। এতে মানসিকভাবে আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন লাকি। পরে তিনি দেবর সালাউদ্দিন ও সহযোগী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা করে মফিজকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ‘থার্টি ফার্স্ট’ উদযাপনের কথা বলে মফিজকে বাসায় ডেকে আনা হয়। তাকে চা ও গরুর মাংসের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। এরপর ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে  তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর নির্মমভাবে লাশের মাথা, হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে টুকরা টুকরা করা হয়; মাথা কেরানীগঞ্জের নিমতলী ব্রিজের পাশে এবং দেহের অন্যান্য অংশ বেউতা এলাকার গণকবরস্থানের পাশের ডোবায় ফেলে দেয়, যাতে পরিচয় গোপন থাকে।

ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে লাকি, সালাউদ্দিন ও নজরুল ইসলামকে গ্রেফতার করে এবং তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হয়ে আত্মগোপনে চলে যায় আসামীরা। মামলার বিচার শেষে আদালত তিনজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। এর মধ্যে নজরুল ইসলাম মারা যায়, সালাউদ্দিন পাসপোর্টে নাম পরিবর্তন করে মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যায় এবং লাকি নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘হাসিনা’ পরিচয়ে ইতালি প্রবাসী হন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক ভেবে সম্প্রতি দেশে ফিরে পুনরায় বিয়ে করে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় আত্মগোপনে ছিলেন তিনি।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে পারেননি। দীর্ঘদিন ধরে পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের তালিকা ধরে সাভার মডেল থানা পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন অনুসন্ধানের মাধ্যমে তার অবস্থান নিশ্চিত করে এবং পরিকল্পিত অভিযানে তাকে গ্রেফতার করে। পুলিশ বলছে, পুরোনো ও আলোচিত মামলাগুলোর আসামীদেরও আইনের আওতায় আনতে তারা ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে।

এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরমান আলী বলেন, “মফিজুর রহমান হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামী দীর্ঘদিন পলাতক ছিল। গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আসামী পরিচয় বদলালেও আইনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই।” দীর্ঘ আট বছর পর নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের মূল আসামী গ্রেফতার হওয়ায় এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে। পুলিশের এই সাফল্য পেশাদারিত্ব ও দৃঢ়তারই আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।