১১:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ২২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মোঃ শাহজাহান বাশার

সীতাকুণ্ডে দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজ তুষার—রাজনৈতিক পরিচয়ে ভয়ভীতি ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:১৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, রোববার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৩১১৭ বার পঠিত হয়েছে

মোঃ শাহজাহান বাশার

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড মহাসড়কে দুর্ঘটনাকবলিত মোকাম লিমিটেডের একটি কাভার্ড ভ্যান উদ্ধারে জীবনঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য সীতাকুণ্ড থানা পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছে রেডেক্স ট্রাকস লিমিটেড কর্তৃপক্ষ। তবে একই সঙ্গে উদ্ধার কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এক যুবদল নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মালামাল লুটের চেষ্টা ও শারীরিক নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ ওঠায় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, গত ১১ তারিখ রাত আনুমানিক ১১টার দিকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কাভার্ড ভ্যানটি মহাসড়কের পাশের একটি গভীর ডোবায় পড়ে যায়। দুর্ঘটনার পরপরই সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে।

ডোবার গভীরতা, কাদামাটি ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে উদ্ধার কাজ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। একপর্যায়ে ব্যবহৃত ক্রেনের তার ছিঁড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। গাড়িটির মূল কাঠামো আংশিক ভেঙে পড়ায় পুনরায় ক্রেন সংযুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে গাড়িটির একটি অংশ সাময়িকভাবে সড়কের ওপর রেখেই উদ্ধার কার্যক্রম স্থগিত করতে হয়।

এরপর গাড়ির ভেতরে থাকা মালামাল স্থানান্তরের কাজ শুরু হলে দেখা যায়, দীর্ঘক্ষণ পানির নিচে থাকায় বস্তাগুলোর ভেতরে পানি ঢুকে অতিরিক্ত ভারী হয়ে গেছে। এতে শ্রমিকদের জন্য কাজটি মারাত্মক কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। উদ্ধারকাজ চলাকালে রাত আনুমানিক ১২টার দিকে লেবার টিমের এক সদস্য গুরুতর আহত হন। শ্রমিকের নিরাপত্তা বিবেচনায় রাত ১২টার পর উদ্ধার কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কর্তৃপক্ষ জানায়, পরদিন সকালে নতুন লেবার টিম নিয়ে অবশিষ্ট মালামাল উদ্ধারের প্রস্তুতি নেওয়া হবে—ইনশাআল্লাহ।

উদ্ধার কার্যক্রম চলাকালে মহাসড়কে সাময়িক যানজট সৃষ্টি হওয়ায় সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের যে ভোগান্তি হয়েছে, সে জন্য মোকাম লিমিটেড কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করেছে।

এ ঘটনায় প্রকাশিত একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কুমিরা এলাকার এক যুবদল নেতা তুষার (স্থানীয়ভাবে তোষার নামে পরিচিত) তার লোকজন নিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ির মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় গাড়ির সঙ্গে থাকা লোকজনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।

এ বিষয়ে কুমিরা থানার এসআই আসাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে অভিযুক্ত ব্যক্তি থানায় যেতে রাজি হয়নি এবং ‘এলাকাতেই মীমাংসা’ করতে চেয়েছে। তিনি বলেন, তিনি এলাকায় রাজনৈতিক নেতা পরিচয়ে প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করেছে, তবে পুলিশের উপস্থিতিতে বড় কিছু করতে পারেনি। পরবর্তীতে স্থানীয়দের ও মোকাম লিমিটেডের প্রতিনিধিদের বরাতে জানা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি নেতা তুষার গাড়ির লোকজনকে শারীরিক নির্যাতন করেছে। বিষয়টি ওসিকে অবহিত করা হয়েছে এবং তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছেন।

মোকাম লিমিটেড সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উদ্ধার কার্যক্রমের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখিয়ে চালক ও মালিক পক্ষের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করেন এবং অর্থ আদায় করেন। এ ঘটনাকে অত্যন্ত নিন্দনীয় ও লজ্জাজনক উল্লেখ করে তারা জানান, অভিযুক্তদের নাম ও ছবি সংরক্ষণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কুমিরা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহাদাত জানান, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। ভুক্তভোগী পক্ষের কেউ থানায় অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের পরিচয় জাতির সামনে প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে—দুর্ঘটনা ও সংকটময় মুহূর্তকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি বা হয়রানি করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের।

অভিযোগের বিষয়ে তুষারের বক্তব্য জানতে বারবার কল করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে অভিযোগকারী পক্ষ জানিয়েছে, তুষারের বক্তব্য পাওয়ার পর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, দুর্ঘটনার সময় পুলিশের সাহসী ভূমিকা প্রশংসনীয় হলেও রাজনৈতিক পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দলের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তারা অবিলম্বে দোষীদের বিরুদ্ধে দলীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ উদ্ধার কাজের মতো মানবিক পরিস্থিতিকে অপরাধের হাতিয়ার বানাতে না পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

অভিনেতা থেকে নেতা: থালাপতি বিজয়ের উত্থানে বদলাচ্ছে তামিলনাড়ুর রাজনীতি

মোঃ শাহজাহান বাশার

সীতাকুণ্ডে দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজ তুষার—রাজনৈতিক পরিচয়ে ভয়ভীতি ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ

Update Time : ১১:১৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, রোববার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫

মোঃ শাহজাহান বাশার

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড মহাসড়কে দুর্ঘটনাকবলিত মোকাম লিমিটেডের একটি কাভার্ড ভ্যান উদ্ধারে জীবনঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য সীতাকুণ্ড থানা পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছে রেডেক্স ট্রাকস লিমিটেড কর্তৃপক্ষ। তবে একই সঙ্গে উদ্ধার কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এক যুবদল নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মালামাল লুটের চেষ্টা ও শারীরিক নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ ওঠায় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, গত ১১ তারিখ রাত আনুমানিক ১১টার দিকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কাভার্ড ভ্যানটি মহাসড়কের পাশের একটি গভীর ডোবায় পড়ে যায়। দুর্ঘটনার পরপরই সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে।

ডোবার গভীরতা, কাদামাটি ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে উদ্ধার কাজ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। একপর্যায়ে ব্যবহৃত ক্রেনের তার ছিঁড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। গাড়িটির মূল কাঠামো আংশিক ভেঙে পড়ায় পুনরায় ক্রেন সংযুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে গাড়িটির একটি অংশ সাময়িকভাবে সড়কের ওপর রেখেই উদ্ধার কার্যক্রম স্থগিত করতে হয়।

এরপর গাড়ির ভেতরে থাকা মালামাল স্থানান্তরের কাজ শুরু হলে দেখা যায়, দীর্ঘক্ষণ পানির নিচে থাকায় বস্তাগুলোর ভেতরে পানি ঢুকে অতিরিক্ত ভারী হয়ে গেছে। এতে শ্রমিকদের জন্য কাজটি মারাত্মক কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। উদ্ধারকাজ চলাকালে রাত আনুমানিক ১২টার দিকে লেবার টিমের এক সদস্য গুরুতর আহত হন। শ্রমিকের নিরাপত্তা বিবেচনায় রাত ১২টার পর উদ্ধার কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কর্তৃপক্ষ জানায়, পরদিন সকালে নতুন লেবার টিম নিয়ে অবশিষ্ট মালামাল উদ্ধারের প্রস্তুতি নেওয়া হবে—ইনশাআল্লাহ।

উদ্ধার কার্যক্রম চলাকালে মহাসড়কে সাময়িক যানজট সৃষ্টি হওয়ায় সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের যে ভোগান্তি হয়েছে, সে জন্য মোকাম লিমিটেড কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করেছে।

এ ঘটনায় প্রকাশিত একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কুমিরা এলাকার এক যুবদল নেতা তুষার (স্থানীয়ভাবে তোষার নামে পরিচিত) তার লোকজন নিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ির মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় গাড়ির সঙ্গে থাকা লোকজনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।

এ বিষয়ে কুমিরা থানার এসআই আসাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে অভিযুক্ত ব্যক্তি থানায় যেতে রাজি হয়নি এবং ‘এলাকাতেই মীমাংসা’ করতে চেয়েছে। তিনি বলেন, তিনি এলাকায় রাজনৈতিক নেতা পরিচয়ে প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করেছে, তবে পুলিশের উপস্থিতিতে বড় কিছু করতে পারেনি। পরবর্তীতে স্থানীয়দের ও মোকাম লিমিটেডের প্রতিনিধিদের বরাতে জানা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি নেতা তুষার গাড়ির লোকজনকে শারীরিক নির্যাতন করেছে। বিষয়টি ওসিকে অবহিত করা হয়েছে এবং তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছেন।

মোকাম লিমিটেড সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উদ্ধার কার্যক্রমের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখিয়ে চালক ও মালিক পক্ষের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করেন এবং অর্থ আদায় করেন। এ ঘটনাকে অত্যন্ত নিন্দনীয় ও লজ্জাজনক উল্লেখ করে তারা জানান, অভিযুক্তদের নাম ও ছবি সংরক্ষণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কুমিরা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহাদাত জানান, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। ভুক্তভোগী পক্ষের কেউ থানায় অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের পরিচয় জাতির সামনে প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে—দুর্ঘটনা ও সংকটময় মুহূর্তকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি বা হয়রানি করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের।

অভিযোগের বিষয়ে তুষারের বক্তব্য জানতে বারবার কল করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে অভিযোগকারী পক্ষ জানিয়েছে, তুষারের বক্তব্য পাওয়ার পর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, দুর্ঘটনার সময় পুলিশের সাহসী ভূমিকা প্রশংসনীয় হলেও রাজনৈতিক পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দলের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তারা অবিলম্বে দোষীদের বিরুদ্ধে দলীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ উদ্ধার কাজের মতো মানবিক পরিস্থিতিকে অপরাধের হাতিয়ার বানাতে না পারে।