
মো. শাহজাহান বাশার
দুর্নীতি এখন আর শুধু একটি অপরাধ নয়—এটি একটি সংগঠিত ব্যবস্থা। এটি এমন এক অদৃশ্য শক্তি, যা রাষ্ট্রের শিরায় শিরায় প্রবেশ করে উন্নয়নের রক্তপ্রবাহকে দূষিত করছে। বাহ্যিকভাবে উন্নয়নের জোয়ার দেখা গেলেও ভেতরে ভেতরে অনেক ক্ষেত্রেই চলছে পরিকল্পিত লুটপাট, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নৈতিক অবক্ষয়ের উৎসব।
রাষ্ট্র যখন বাজেট ঘোষণা করে, তখন কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন সেই সংখ্যার সাথে জড়িয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—বাজেটের বড় একটি অংশ নানা কৌশলে গায়েব হয়ে যায়। প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো, নিম্নমানের কাজ, ভুয়া বিল-ভাউচার, কাগুজে উন্নয়ন—এসব এখন আর নতুন কিছু নয়। উন্নয়নের নামে গড়ে ওঠে একেকটি ‘লুটপাটের চক্র’, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক আশ্রয় এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ এক সুতোয় গাঁথা।
দুর্নীতি একা আসে না; এটি ক্ষমতার সঙ্গে হাত মিলিয়ে আসে। একটি টেন্ডার প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ না হয়, তাহলে সেখানে প্রতিযোগিতা নয়, প্রভাবই বিজয়ী হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি ও ঘুষের সংস্কৃতি যোগ্যতাকে অপমান করে। ফলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন অযোগ্য ও অনৈতিক ব্যক্তিরা—যারা পরে আরও বড় দুর্নীতির জন্ম দেন।
এভাবেই দুর্নীতি ব্যক্তি পর্যায় থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। একটি অফিসে যদি ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না, সেটি আর ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়—এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধি। আর যখন ব্যাধি প্রাতিষ্ঠানিক হয়, তখন তার চিকিৎসাও কঠিন হয়ে পড়ে।
দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় অর্থনীতিতে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একটি দেশের স্বচ্ছতা, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতা দেখে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু যখন তারা দেখেন দুর্নীতি সর্বব্যাপী, তখন আস্থা হারিয়ে ফেলেন।
ব্যাংক খাতে অনিয়ম, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি, প্রভাবশালীদের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ—এসবের বোঝা শেষ পর্যন্ত পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। কর বাড়ে, মূল্যস্ফীতি বাড়ে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। অথচ দুর্নীতিবাজরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করে, বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলে।
স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি মানে কেবল অর্থ লুট নয়—এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা। ভুয়া ওষুধ, নকল সরঞ্জাম, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা—এসবের ফলে রোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। অনেক সময় জীবনও হারান।
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রশ্নফাঁস, নিয়োগ বাণিজ্য, সনদ জালিয়াতি—এসব ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দুর্বল করে দেয়। একজন মেধাবী ছাত্র যখন দেখে টাকার কাছে মেধা পরাজিত, তখন তার ভেতরে জন্ম নেয় হতাশা। এই হতাশাই একসময় সমাজে নেতিবাচক শক্তি হিসেবে ফিরে আসে।
দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি একটি নৈতিক সংকট। যখন একটি শিশু দেখে তার বাবা “কিছু না দিলে কাজ হয় না” বলে ঘুষ দেয়, তখন সে শিখে যায়—অসততা স্বাভাবিক। এভাবেই দুর্নীতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।
আমরা আজ এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে সততা অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। অথচ সততাই একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। নৈতিকতা ভেঙে পড়লে উন্নয়নের অট্টালিকা টেকসই হয় না।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সচেতন নাগরিক সমাজ এবং স্বাধীন গণমাধ্যম। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্নীতির মুখোশ খুলে দিতে পারে। তবে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। তথ্য অধিকার আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। স্বচ্ছতা বাড়াতে ডিজিটাল সিস্টেম, ই-গভর্ন্যান্স, অনলাইন ট্র্যাকিং—এসব জোরদার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। ঘুষ দেওয়া যেমন অপরাধ, তেমনি ঘুষ নেওয়াও অপরাধ। আমরা যদি নিজের সুবিধার জন্য ছোটখাটো দুর্নীতিকে মেনে নিই, তাহলে বড় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার নৈতিক অধিকার হারাই।
দুর্নীতি দমনে প্রয়োজন তিনটি বিষয়—১. কঠোর ও নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ ,২. প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ,৩. নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক আন্দোলন
প্রভাবশালী ব্যক্তি হোক বা সাধারণ নাগরিক—আইনের চোখে সবাই সমান হতে হবে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বড় দুর্নীতির বিচার যদি দৃশ্যমানভাবে হয়, তাহলে তা সমাজে শক্ত বার্তা দেবে।
দুর্নীতি আমাদের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শত্রু। এটি শুধু অর্থ চুরি করে না; এটি স্বপ্ন চুরি করে, ভবিষ্যৎ চুরি করে, ন্যায়বিচার চুরি করে।
আমরা কি নীরব দর্শক হয়ে থাকব? নাকি নিজেদের অবস্থান থেকে সততার পক্ষে দাঁড়াব?
রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন হতে হবে। কারণ ইতিহাস সাক্ষী—যে জাতি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়, সে জাতি দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।





















