
মোঃ শাহজাহান বাশার
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন দেশটির ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর গত ৪৭ বছরের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। দেশজুড়ে একযোগে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত রাস্তায় নেমে আসা সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ, শাসকগোষ্ঠীর প্রতি গভীর অসন্তোষ এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে এবারের আন্দোলনকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ভয়াবহ ও বিস্তৃত বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইরানের বিভিন্ন বড় শহরসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলোতে একযোগে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, নারী, তরুণ সমাজ এমনকি মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় একটি অংশ এই আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হয়েছে। আগের আন্দোলনগুলোতে যেখানে নির্দিষ্ট শ্রেণি বা ইস্যুকেন্দ্রিক প্রতিবাদ দেখা যেত, সেখানে এবারের বিক্ষোভ সরাসরি রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসন কাঠামোর বিরুদ্ধেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনের মূল শক্তি হলো ভয়ভীতি উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের প্রকাশ্য অংশগ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত সংগঠিত হওয়া।
বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মাধ্যমে গ্রেপ্তার, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগব্যবস্থা সীমিতকরণ এবং বিক্ষোভস্থলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে আগের মতো শুধু দমন-পীড়ন দিয়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না বলেই মত বিশ্লেষকদের।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, দমনমূলক পদক্ষেপের পরও আন্দোলনের গতি থেমে নেই, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরও তীব্র হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়াতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই অবস্থান ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের জবাবে ইরানি কর্তৃপক্ষ কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হলে ওই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা চালানো হতে পারে। এই হুমকি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের আন্দোলন আগের তুলনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে আলাদা—আন্দোলনের বিস্তার দেশব্যাপী ও একযোগে,শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ,জনগণের ভয়ভীতি ভাঙা মানসিকতা ,আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রকাশ্য অবস্থান
এই সবকিছু মিলিয়ে ইরান এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরান হয় আরও কঠোর দমননীতির পথে হাঁটবে, নয়তো বড় ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতার দিকে যেতে বাধ্য হবে। তবে যে পথই বেছে নেওয়া হোক না কেন, এবারের সরকারবিরোধী আন্দোলন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Reporter Name 















