০২:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তারেক রহমান ও বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতি: নেতৃত্ব, দায়িত্ব ও সময়ের কঠিন প্রশ্ন

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৯:৩৬:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারি ২০২৬
  • ৩১০৬ বার পঠিত হয়েছে

মোঃ শাহজাহান বাশার

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে ভুল সিদ্ধান্ত দলটিকে আরও কোণঠাসা করতে পারে, আবার সঠিক কৌশল নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিতে পারে। এই বাস্তবতায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে দলটির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি।

বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও কার্যত রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান বিএনপির একমাত্র দৃশ্যমান শীর্ষ নেতৃত্ব। সাংগঠনিকভাবে তিনিই দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু। আন্দোলন, বিবৃতি, কর্মসূচি—সবকিছুর দিকনির্দেশনা আসছে তার নেতৃত্ব থেকেই। ফলে বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতির সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার দায়ভারও স্বাভাবিকভাবেই তার কাঁধেই এসে পড়ছে।

গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপির রাজনীতি মূলত আন্দোলনকেন্দ্রিক। নির্দলীয় সরকারের দাবি, নির্বাচন বর্জন, আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ—এই কৌশলগুলো একসময় দলকে আলোচনায় রাখলেও বাস্তব রাজনৈতিক অর্জন খুব সীমিতই হয়েছে। বরং বারবার ব্যর্থ আন্দোলন দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—তারেক রহমান কি এখনও কেবল আন্দোলনের রাজনীতিতেই আস্থা রাখবেন, নাকি নির্বাচনী ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির বাস্তবতাকে স্বীকার করে নতুন পথে হাঁটবেন? ইতিহাস বলে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন নির্বাচনবিমুখ রাজনীতি শেষ পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক শক্তিকেই দুর্বল করে।

তারেক রহমানের রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। মাঠের রাজনীতি, সরাসরি জনসম্পৃক্ততা ও তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় এটি একটি বড় সীমাবদ্ধতা। ভার্চুয়াল বক্তব্য বা বিদেশ থেকে নির্দেশনা দিয়ে দীর্ঘদিন একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে সক্রিয় ও ঐক্যবদ্ধ রাখা কঠিন।

বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা এখন এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করেন, যিনি মাঠে থাকবেন, তাদের সঙ্গে থাকবেন এবং প্রয়োজনে ঝুঁকি নেবেন। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করলে দলের সঙ্গে নেতৃত্বের দূরত্ব আরও বাড়তে পারে।

বিএনপির রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগটি ঘুরে ফিরে আসে, তা হলো—দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের প্রাধান্য। তারেক রহমানের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, তিনি কি দলকে সত্যিকার অর্থে সংস্কারের পথে নিতে পারবেন? দুর্নীতি, দখলবাজি ও সুবিধাবাদী রাজনীতির অভিযোগে অভিযুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নিলে বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।

একই সঙ্গে তরুণ সমাজকে সামনে আনার কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা এখনও বিএনপির রাজনীতিতে দৃশ্যমান নয়। কেবল অতীত স্মৃতি ও সরকারবিরোধী বক্তব্য দিয়ে নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করা যাবে না।

বাংলাদেশের জনগণ এখন উত্তেজনাপূর্ণ স্লোগানের চেয়ে স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দেখতে চায়। তারেক রহমান যদি বিএনপিকে একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন, নির্বাচনী রাজনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন এবং দলীয় সংস্কারে সাহসী সিদ্ধান্ত নেন—তবেই বিএনপির রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হতে পারে।

অন্যথায়, বিএনপি যদি কেবল অতীতের অভিযোগ, অনিশ্চিত আন্দোলন ও দূরবর্তী নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে চলে, তাহলে দলটির রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা আরও প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

তারেক রহমান আজ বিএনপির জন্য একই সঙ্গে শেষ ভরসা ও সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ইতিহাস তাকে কোন জায়গায় দাঁড় করাবে, তা নির্ধারিত হবে তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, বাস্তবতার স্বীকৃতি এবং দলের ভেতরে ও বাইরে আস্থা ফেরানোর ক্ষমতার ওপর।

বিএনপির সামনে সময় খুব বেশি নেই। সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই—আবেগের রাজনীতি, নাকি বাস্তবতার রাজনীতি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

জামায়াতের মিথ্যাচার জনগণ ক্ষমা করবে না: মির্জা ফখরুল

তারেক রহমান ও বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতি: নেতৃত্ব, দায়িত্ব ও সময়ের কঠিন প্রশ্ন

Update Time : ০৯:৩৬:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারি ২০২৬

মোঃ শাহজাহান বাশার

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে ভুল সিদ্ধান্ত দলটিকে আরও কোণঠাসা করতে পারে, আবার সঠিক কৌশল নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিতে পারে। এই বাস্তবতায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে দলটির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি।

বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও কার্যত রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান বিএনপির একমাত্র দৃশ্যমান শীর্ষ নেতৃত্ব। সাংগঠনিকভাবে তিনিই দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু। আন্দোলন, বিবৃতি, কর্মসূচি—সবকিছুর দিকনির্দেশনা আসছে তার নেতৃত্ব থেকেই। ফলে বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতির সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার দায়ভারও স্বাভাবিকভাবেই তার কাঁধেই এসে পড়ছে।

গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপির রাজনীতি মূলত আন্দোলনকেন্দ্রিক। নির্দলীয় সরকারের দাবি, নির্বাচন বর্জন, আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ—এই কৌশলগুলো একসময় দলকে আলোচনায় রাখলেও বাস্তব রাজনৈতিক অর্জন খুব সীমিতই হয়েছে। বরং বারবার ব্যর্থ আন্দোলন দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—তারেক রহমান কি এখনও কেবল আন্দোলনের রাজনীতিতেই আস্থা রাখবেন, নাকি নির্বাচনী ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির বাস্তবতাকে স্বীকার করে নতুন পথে হাঁটবেন? ইতিহাস বলে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন নির্বাচনবিমুখ রাজনীতি শেষ পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক শক্তিকেই দুর্বল করে।

তারেক রহমানের রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। মাঠের রাজনীতি, সরাসরি জনসম্পৃক্ততা ও তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় এটি একটি বড় সীমাবদ্ধতা। ভার্চুয়াল বক্তব্য বা বিদেশ থেকে নির্দেশনা দিয়ে দীর্ঘদিন একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে সক্রিয় ও ঐক্যবদ্ধ রাখা কঠিন।

বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা এখন এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করেন, যিনি মাঠে থাকবেন, তাদের সঙ্গে থাকবেন এবং প্রয়োজনে ঝুঁকি নেবেন। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করলে দলের সঙ্গে নেতৃত্বের দূরত্ব আরও বাড়তে পারে।

বিএনপির রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগটি ঘুরে ফিরে আসে, তা হলো—দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের প্রাধান্য। তারেক রহমানের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, তিনি কি দলকে সত্যিকার অর্থে সংস্কারের পথে নিতে পারবেন? দুর্নীতি, দখলবাজি ও সুবিধাবাদী রাজনীতির অভিযোগে অভিযুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নিলে বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।

একই সঙ্গে তরুণ সমাজকে সামনে আনার কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা এখনও বিএনপির রাজনীতিতে দৃশ্যমান নয়। কেবল অতীত স্মৃতি ও সরকারবিরোধী বক্তব্য দিয়ে নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করা যাবে না।

বাংলাদেশের জনগণ এখন উত্তেজনাপূর্ণ স্লোগানের চেয়ে স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দেখতে চায়। তারেক রহমান যদি বিএনপিকে একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন, নির্বাচনী রাজনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন এবং দলীয় সংস্কারে সাহসী সিদ্ধান্ত নেন—তবেই বিএনপির রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হতে পারে।

অন্যথায়, বিএনপি যদি কেবল অতীতের অভিযোগ, অনিশ্চিত আন্দোলন ও দূরবর্তী নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে চলে, তাহলে দলটির রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা আরও প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

তারেক রহমান আজ বিএনপির জন্য একই সঙ্গে শেষ ভরসা ও সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ইতিহাস তাকে কোন জায়গায় দাঁড় করাবে, তা নির্ধারিত হবে তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, বাস্তবতার স্বীকৃতি এবং দলের ভেতরে ও বাইরে আস্থা ফেরানোর ক্ষমতার ওপর।

বিএনপির সামনে সময় খুব বেশি নেই। সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই—আবেগের রাজনীতি, নাকি বাস্তবতার রাজনীতি।