
মোঃ শাহজাহান বাশার
দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে এবং কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় এবার পেঁয়াজ আমদানি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে যেমন দেশের কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, অন্যদিকে চরম বিপাকে পড়েছেন ভারতীয় রপ্তানিকারকরা। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বাংলাদেশের সেই বড় ব্যবসায়ীরা, যারা দীর্ঘদিন ধরে পেঁয়াজ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থেকে বছরের নির্দিষ্ট সময়কে কেন্দ্র করে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতেন। ভেঙে গেছে দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট চক্রের ব্যবসাও।
ভারতের ঘোজাডাঙ্গা, পেট্রাপোল, মাহাদিপুর ও হিলি সীমান্ত এলাকায় অন্তত ৩০ হাজার টন পেঁয়াজ মজুত করা হয়েছিল বাংলাদেশে রপ্তানির উদ্দেশ্যে। বাংলাদেশে আমদানির অনুমতি না পাওয়ায় এখন সেসব পেঁয়াজ পচনের মুখে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা প্রতি কেজি মাত্র ২ রুপিতে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ৫০ কেজির একটি বস্তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০০ রুপিতে।
রপ্তানিকারকদের দাবি—বাংলাদেশ শেষ মুহূর্তে আমদানি বন্ধ করে দেওয়ায় তাদের কোটি কোটি রুপির ক্ষতি হয়েছে।
হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক বলেন—
“ক্ষতির কথা বলে শেষ করা যাবে না। সরকার কেন ব্যবসায়ীদের এমন ক্ষতির মুখে ফেলল তা বোধগম্য নয়।”
সেই একই অভিযোগ করেন হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সহ-সভাপতি শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন—“অগ্রিম অর্ডার দিয়ে হাজার হাজার টন পেঁয়াজ সীমান্তে এনে রেখেছিলেন ব্যবসায়ীরা। সরকারের আইপি না দেওয়ায় তা খালাস করা যায়নি। ভবিষ্যতের জন্য এটি খারাপ নজির।”
ব্যবসায়ীরা জানান, নাসিক থেকে ১৬ রুপিতে কেনা প্রতিকেজি পেঁয়াজ মিলিয়ে পরিবহনসহ খরচ দাঁড়িয়েছিল ২২ রুপি। পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশে ৩০–৩২ রুপিতে বিক্রি করলে কেজিতে ৮–১০ রুপি লাভ হতো। কিন্তু এখন মূলত লাভ নয়—পুঁজিই উদ্ধার করা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, এই সিদ্ধান্ত সিন্ডিকেটদের জন্য একটি কঠোর বার্তা। কারও ইচ্ছেমতো দেশে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আমদানির চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ এবার বন্ধ হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) ড. জামাল উদ্দীন বলেন—
“এর আগে কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে বছরের শেষ দিকে দাম বাড়িয়ে আমদানিকে বাধ্য করত। এবার কৃষকদের হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি ছিল। তারা পেঁয়াজ বাজারে ছেড়ে দিয়ে সিন্ডিকেটের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়েছেন।”
তিনি আরও জানান—“দেশে এখন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ৪৪ লাখ টন, যেখানে চাহিদা মাত্র ২৮ লাখ টন। পুরোনো তিন লাখ টন রয়েছে কৃষকের হাতে। গ্রীষ্মকালীন ৭০-৮০ হাজার টন বাজারে এসেছে। ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে আরও আড়াই লাখ টন মুড়িকাটা পেঁয়াজ আসবে। ফেব্রুয়ারিতে নতুন মৌসুম শুরু হবে।”
গত বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন—
“কৃষকের স্বার্থে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে না। কিছু ব্যবসায়ী আদালতে গেলেও আমদানি অনুমতি দেওয়া হবে না।”
তিনি জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে ২,৮০০টি আমদানির আবেদন জমা পড়েছিল, কিন্তু কোনোটি আমলে নেওয়া হয়নি।
এবার যখন বেসরকারি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট পেঁয়াজের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে চেষ্টা চালায়, তখন কৃষকরা তাদের হাতে থাকা পেঁয়াজ বাজারে ছাড়েন। এতে মূল্য নিয়ন্ত্রণে আসে এবং আমদানি নির্ভরতা কমানোর সরকারের পরিকল্পনা সফল হয়।
ভারতের মহাদিপুর–সোনামসজিদ সীমান্তে এখন: প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২ রুপি ,৫০ কেজির বস্তা ১০০ রুপি ,২২ রুপিতে কেনা পেঁয়াজ এখন প্রায় বিনামূল্যে বিক্রি ,প্রতিদিন শতাধিক শ্রমিক দিয়ে পচা ও ভালো পেঁয়াজ আলাদা করা হচ্ছে
ব্যবসায়ীদের ভাষায়—“বাংলাদেশের সিদ্ধান্তই সীমান্তে এ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে।”
সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে যেমন দেশ পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বাবলম্বীতার দিকে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে, অন্যদিকে আমদানিনির্ভর ব্যবসায়ীরা নানা ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে—দীর্ঘমেয়াদে এটি কৃষক, ভোক্তা ও দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে এবং ভবিষ্যতে সিন্ডিকেট নির্ভর মূল্যবৃদ্ধি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


















