১০:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাবের হোসেন চৌধুরীর বাসায় তিন রাষ্ট্রদূতের গোপন বৈঠক

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:০৬:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর ২০২৫
  • ৩০৮৪ বার পঠিত হয়েছে

মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে উত্তপ্ত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর গুলশান বাসভবনে নর্ডিক তিন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত গোপন বৈঠক করেছেন।

জানা গেছে, সোমবার (৬ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকায় নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যাকন আরাল্ড গুলব্রানসেন, সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস লিনাস রাগনার উইকস এবং ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মলার সাবের হোসেন চৌধুরীর বাসায় এই বৈঠকে অংশ নেন।

এই তিন রাষ্ট্রই স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ, যারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন ও মানবাধিকার খাতে সহযোগিতা করে আসছে।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুর ২টা ৫৫ মিনিটে শুরু হয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে এ বৈঠক। তিন রাষ্ট্রদূত কূটনৈতিক প্রটোকলবিহীনভাবে (ফ্ল্যাগ ছাড়া) একই গাড়িতে গুলশান-২-এর বাসভবনে প্রবেশ করেন এবং নজর এড়াতে বৈঠক শেষে বিকল্প পথে স্থান ত্যাগ করেন।

সূত্র জানায়, বৈঠকে আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ কৌশল এবং নিষিদ্ধ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কূটনীতিকরা জানতে চান, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দলটি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা করছে কি না এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান কী হতে পারে।

তারা আরও মত দেন— আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় দলের স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য সদস্যদের যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় রাখা সহজ হবে এবং এতে বিদেশি কূটনীতিকদের আপত্তি থাকবে না।

তবে বৈঠক শেষে কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ করেনি।

এর আগে গত ১১ মে সন্ধ্যায় সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন বৈঠক করেন। সেদিনও বৈঠকটি হয়েছিল কঠোর গোপনীয়তায়।
ওই বৈঠকেও আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পুনরায় শুরু এবং দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয় বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গিয়েছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো অতি টালমাটাল।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার পতন ঘটে এবং তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকেই আওয়ামী লীগ দলটি কার্যত নিষিদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার বা নিপীড়নের শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাবের হোসেন চৌধুরী নিজেও গত অক্টোবরে গুলশান থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন একটি হত্যা মামলাসহ ছয়টি মামলায়, যদিও পরবর্তীতে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্ক বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মানবাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) বাস্তবায়নে এই দেশগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাবের হোসেন চৌধুরী পরিবেশমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে এই দেশগুলোর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত ও কূটনৈতিক যোগাযোগ ছিল ঘনিষ্ঠ।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, সাবের হোসেন চৌধুরীর বাসভবনে তিন বিদেশি রাষ্ট্রদূতের এই বৈঠক কেবল একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়—
বরং এটি হতে পারে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের ইঙ্গিত।
তারা মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পরবর্তী নির্বাচনে আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকা ও অবস্থান বোঝার জন্যও এই বৈঠকটি তাৎপর্যপূর্ণ।

এ বিষয়ে সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নর্ডিক দেশগুলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিদেশি কূটনীতিকদের সক্রিয়তা নতুন কিছু নয়। তবে ক্ষমতাচ্যুত দলের এক সাবেক মন্ত্রীর বাসায় তিন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান রাষ্ট্রদূতের এই গোপন বৈঠক নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
এই বৈঠক হয়তো ভবিষ্যৎ নির্বাচন ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে— এমনটাই ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান-শাহসূফি ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল-হাসানী

সাবের হোসেন চৌধুরীর বাসায় তিন রাষ্ট্রদূতের গোপন বৈঠক

Update Time : ১১:০৬:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর ২০২৫

মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে উত্তপ্ত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর গুলশান বাসভবনে নর্ডিক তিন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত গোপন বৈঠক করেছেন।

জানা গেছে, সোমবার (৬ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকায় নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যাকন আরাল্ড গুলব্রানসেন, সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস লিনাস রাগনার উইকস এবং ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মলার সাবের হোসেন চৌধুরীর বাসায় এই বৈঠকে অংশ নেন।

এই তিন রাষ্ট্রই স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ, যারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন ও মানবাধিকার খাতে সহযোগিতা করে আসছে।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুর ২টা ৫৫ মিনিটে শুরু হয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে এ বৈঠক। তিন রাষ্ট্রদূত কূটনৈতিক প্রটোকলবিহীনভাবে (ফ্ল্যাগ ছাড়া) একই গাড়িতে গুলশান-২-এর বাসভবনে প্রবেশ করেন এবং নজর এড়াতে বৈঠক শেষে বিকল্প পথে স্থান ত্যাগ করেন।

সূত্র জানায়, বৈঠকে আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ কৌশল এবং নিষিদ্ধ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কূটনীতিকরা জানতে চান, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দলটি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা করছে কি না এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান কী হতে পারে।

তারা আরও মত দেন— আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় দলের স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য সদস্যদের যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় রাখা সহজ হবে এবং এতে বিদেশি কূটনীতিকদের আপত্তি থাকবে না।

তবে বৈঠক শেষে কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ করেনি।

এর আগে গত ১১ মে সন্ধ্যায় সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন বৈঠক করেন। সেদিনও বৈঠকটি হয়েছিল কঠোর গোপনীয়তায়।
ওই বৈঠকেও আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পুনরায় শুরু এবং দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয় বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গিয়েছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো অতি টালমাটাল।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার পতন ঘটে এবং তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকেই আওয়ামী লীগ দলটি কার্যত নিষিদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার বা নিপীড়নের শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাবের হোসেন চৌধুরী নিজেও গত অক্টোবরে গুলশান থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন একটি হত্যা মামলাসহ ছয়টি মামলায়, যদিও পরবর্তীতে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্ক বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মানবাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) বাস্তবায়নে এই দেশগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাবের হোসেন চৌধুরী পরিবেশমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে এই দেশগুলোর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত ও কূটনৈতিক যোগাযোগ ছিল ঘনিষ্ঠ।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, সাবের হোসেন চৌধুরীর বাসভবনে তিন বিদেশি রাষ্ট্রদূতের এই বৈঠক কেবল একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়—
বরং এটি হতে পারে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের ইঙ্গিত।
তারা মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পরবর্তী নির্বাচনে আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকা ও অবস্থান বোঝার জন্যও এই বৈঠকটি তাৎপর্যপূর্ণ।

এ বিষয়ে সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নর্ডিক দেশগুলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিদেশি কূটনীতিকদের সক্রিয়তা নতুন কিছু নয়। তবে ক্ষমতাচ্যুত দলের এক সাবেক মন্ত্রীর বাসায় তিন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান রাষ্ট্রদূতের এই গোপন বৈঠক নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
এই বৈঠক হয়তো ভবিষ্যৎ নির্বাচন ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে— এমনটাই ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।