০৬:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেখ হাসিনার পতন বিএনপির জন্য বিষফোড়া: নেতৃত্বহীনতায় দিশেহারা দল

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:২০:৪৪ পূর্বাহ্ন, রোববার, ১৯ অক্টোবর ২০২৫
  • ৩০৮৩ বার পঠিত হয়েছে

মো. শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

ঢাকা, ১৮ অক্টোবর — শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের রাজনীতিতে নতুন এক বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনও বিএনপির জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং এক গভীর আত্মসমালোচনার সময় এনে দিয়েছে। গত ১৭ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনের পেছনে বিএনপির দুর্বলতা, রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব সংকটকে অনেকেই দায়ী করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসন টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বিএনপির অদূরদর্শিতা ও সাংগঠনিক ব্যর্থতা। দলটি নেতৃত্ব সংকটে এতটাই জর্জরিত ছিল যে, প্রতিবার আন্দোলনের আগুন জ্বালিয়েও তা ধরে রাখতে পারেনি।
২০০৭ সালের পর থেকে বিএনপি একাধিকবার রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু বারবার ভেঙে পড়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে। কথার কথায় শীর্ষ পর্যায়ে বড় বড় নেতাদের বহিষ্কার ও প্রবীণ নেতাদের মৃত্যুতে দলটি কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।
কর্মীরা মাঠে সক্রিয় থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনা অনিশ্চিত থাকায় আন্দোলন বা নির্বাচনী প্রস্তুতি দুই-ই ব্যর্থ হয়েছে।
একাধিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বলছেন, “বিএনপি গত ১৭ বছর ধরে যেন আওয়ামী লীগকে ইচ্ছে করেই খালি মাঠে গোল করার সুযোগ দিয়েছে।”
শেখ হাসিনার সময়ে যদি বিএনপি প্রতিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করত, তাহলে অন্তত দেশের ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতো। তাছাড়া অংশগ্রহণের মাধ্যমে তরুণ নেতৃত্ব গড়ে ওঠার সুযোগও থাকত।
কিন্তু দলটি বারবার নির্বাচন বর্জন করে রাজনীতিকে মাঠহীন করে ফেলে। ফলে সাংগঠনিক পুনর্গঠন বা রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, কোনোটাই এগোয়নি।
অনেকে মনে করেন, “বিএনপি নেতৃত্ব হয়তো নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য ঠিক রাখতেই ব্যস্ত ছিল। রাজনীতি তাদের কাছে পেশার চেয়ে কম্প্রোমাইজের জায়গা হয়ে গিয়েছিল।”
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময়ে জামায়াতে ইসলামী এক অন্যধরনের কৌশল নিয়েছে। তারা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় পাঠিয়ে, প্রভাবশালী জায়গায় ঢুকিয়েছে। অনেকে আওয়ামী লীগের ভেতরেই ঢুকে পদ-পদবি কিনে ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছেছে।
এই ছদ্মবেশী জামায়াতিদের কারণে আওয়ামী লীগের ভেতর অগোছালোতা দেখা দেয়, যা শেখ হাসিনার পতনের পেছনের অন্যতম কারণ বলেও অনেকে মনে করেন।
ছাত্র আন্দোলন, বিশেষ করে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সরকার সরাসরি কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেনি—কারণ ‘যার গায়ে হাত তুলবে, সে আওয়ামী লীগের কর্মী’—এমন বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল।
শেখ হাসিনার পতনের পরও বিএনপি স্বস্তিতে নেই। জামায়াত এখন সচিবালয় থেকে শুরু করে সরকারি অফিস পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান পোক্ত করছে। অথচ বিএনপি এখনো মাঠে বিভক্ত, একে অপরের বিরুদ্ধে দখল নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত।
বিভিন্ন স্থানে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত ও পারস্পরিক অবিশ্বাস সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করছে।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “বিএনপি এখন এমন অবস্থায়, যেখানে জনগণ মুখে কিছু না বললেও মনে মনে তাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করছে।”
সাম্প্রতিক এক নির্বাচনে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের ভোটাররা বিএনপিকে না দিয়ে জামায়াতকে ভোট দিয়েছে। বিএনপির অভিযোগ, আওয়ামী লীগ নাকি জামায়াতকে জিতিয়ে দিয়েছে।
যদি সেটি সত্যি হয়, তাহলে প্রশ্ন আসে—এই সম্পর্কের সূত্রপাত কোথায়? অনেকের মতে, ছদ্মবেশী জামায়াতপন্থিরা আওয়ামী লীগের মধ্যেই ছিল এবং সেই সম্পর্কই তাদের জয়ের সহায়ক হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি যদি আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে এককভাবে ভোটে নামে, তাহলে তাদের অস্তিত্ব সংকট আরও গভীর হবে। আবার আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে গেলে তারা প্রধান বিরোধী দল হয়ে পড়বে—অর্থাৎ ক্ষমতা থেকে দূরে থাকবে।
অন্যদিকে, যুদ্ধাপরাধীদের ঘৃণা করে আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই যাবে না। ফলে জামায়াত যদি ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনায় আসে, তবে বিএনপির রাজনীতি কার্যত বিলীন হয়ে যেতে পারে।
অনেক পর্যবেক্ষকের অভিমত—“জামায়াত রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগ ছয় মাসের মধ্যেই শক্ত হাতে ক্ষমতা ফিরে নিতে পারে, কিন্তু বিএনপি তখন আর রাজনৈতিকভাবে পুনরুত্থান ঘটাতে পারবে না।”
বিএনপি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামান্য একটি ভুল সিদ্ধান্ত তাদের মতো ঐতিহ্যবাহী দলকে রাজনৈতিক বিপর্যয়ে ফেলে দিতে পারে। এখনই তাদের উচিত—অভ্যন্তরীণ ঐক্য ফিরিয়ে আনা, তরুণ নেতৃত্ব তৈরি করা, এবং বাস্তব রাজনীতির মাঠে ফিরে আসা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

আলোচনার আশ্বাসে নাগেশ্বরীতে সাংবাদিকের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন স্থগিত

শেখ হাসিনার পতন বিএনপির জন্য বিষফোড়া: নেতৃত্বহীনতায় দিশেহারা দল

Update Time : ১১:২০:৪৪ পূর্বাহ্ন, রোববার, ১৯ অক্টোবর ২০২৫

মো. শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

ঢাকা, ১৮ অক্টোবর — শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের রাজনীতিতে নতুন এক বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনও বিএনপির জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং এক গভীর আত্মসমালোচনার সময় এনে দিয়েছে। গত ১৭ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনের পেছনে বিএনপির দুর্বলতা, রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব সংকটকে অনেকেই দায়ী করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসন টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বিএনপির অদূরদর্শিতা ও সাংগঠনিক ব্যর্থতা। দলটি নেতৃত্ব সংকটে এতটাই জর্জরিত ছিল যে, প্রতিবার আন্দোলনের আগুন জ্বালিয়েও তা ধরে রাখতে পারেনি।
২০০৭ সালের পর থেকে বিএনপি একাধিকবার রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু বারবার ভেঙে পড়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে। কথার কথায় শীর্ষ পর্যায়ে বড় বড় নেতাদের বহিষ্কার ও প্রবীণ নেতাদের মৃত্যুতে দলটি কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।
কর্মীরা মাঠে সক্রিয় থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনা অনিশ্চিত থাকায় আন্দোলন বা নির্বাচনী প্রস্তুতি দুই-ই ব্যর্থ হয়েছে।
একাধিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বলছেন, “বিএনপি গত ১৭ বছর ধরে যেন আওয়ামী লীগকে ইচ্ছে করেই খালি মাঠে গোল করার সুযোগ দিয়েছে।”
শেখ হাসিনার সময়ে যদি বিএনপি প্রতিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করত, তাহলে অন্তত দেশের ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতো। তাছাড়া অংশগ্রহণের মাধ্যমে তরুণ নেতৃত্ব গড়ে ওঠার সুযোগও থাকত।
কিন্তু দলটি বারবার নির্বাচন বর্জন করে রাজনীতিকে মাঠহীন করে ফেলে। ফলে সাংগঠনিক পুনর্গঠন বা রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, কোনোটাই এগোয়নি।
অনেকে মনে করেন, “বিএনপি নেতৃত্ব হয়তো নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য ঠিক রাখতেই ব্যস্ত ছিল। রাজনীতি তাদের কাছে পেশার চেয়ে কম্প্রোমাইজের জায়গা হয়ে গিয়েছিল।”
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময়ে জামায়াতে ইসলামী এক অন্যধরনের কৌশল নিয়েছে। তারা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় পাঠিয়ে, প্রভাবশালী জায়গায় ঢুকিয়েছে। অনেকে আওয়ামী লীগের ভেতরেই ঢুকে পদ-পদবি কিনে ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছেছে।
এই ছদ্মবেশী জামায়াতিদের কারণে আওয়ামী লীগের ভেতর অগোছালোতা দেখা দেয়, যা শেখ হাসিনার পতনের পেছনের অন্যতম কারণ বলেও অনেকে মনে করেন।
ছাত্র আন্দোলন, বিশেষ করে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সরকার সরাসরি কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেনি—কারণ ‘যার গায়ে হাত তুলবে, সে আওয়ামী লীগের কর্মী’—এমন বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল।
শেখ হাসিনার পতনের পরও বিএনপি স্বস্তিতে নেই। জামায়াত এখন সচিবালয় থেকে শুরু করে সরকারি অফিস পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান পোক্ত করছে। অথচ বিএনপি এখনো মাঠে বিভক্ত, একে অপরের বিরুদ্ধে দখল নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত।
বিভিন্ন স্থানে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত ও পারস্পরিক অবিশ্বাস সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করছে।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “বিএনপি এখন এমন অবস্থায়, যেখানে জনগণ মুখে কিছু না বললেও মনে মনে তাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করছে।”
সাম্প্রতিক এক নির্বাচনে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের ভোটাররা বিএনপিকে না দিয়ে জামায়াতকে ভোট দিয়েছে। বিএনপির অভিযোগ, আওয়ামী লীগ নাকি জামায়াতকে জিতিয়ে দিয়েছে।
যদি সেটি সত্যি হয়, তাহলে প্রশ্ন আসে—এই সম্পর্কের সূত্রপাত কোথায়? অনেকের মতে, ছদ্মবেশী জামায়াতপন্থিরা আওয়ামী লীগের মধ্যেই ছিল এবং সেই সম্পর্কই তাদের জয়ের সহায়ক হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি যদি আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে এককভাবে ভোটে নামে, তাহলে তাদের অস্তিত্ব সংকট আরও গভীর হবে। আবার আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে গেলে তারা প্রধান বিরোধী দল হয়ে পড়বে—অর্থাৎ ক্ষমতা থেকে দূরে থাকবে।
অন্যদিকে, যুদ্ধাপরাধীদের ঘৃণা করে আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই যাবে না। ফলে জামায়াত যদি ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনায় আসে, তবে বিএনপির রাজনীতি কার্যত বিলীন হয়ে যেতে পারে।
অনেক পর্যবেক্ষকের অভিমত—“জামায়াত রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগ ছয় মাসের মধ্যেই শক্ত হাতে ক্ষমতা ফিরে নিতে পারে, কিন্তু বিএনপি তখন আর রাজনৈতিকভাবে পুনরুত্থান ঘটাতে পারবে না।”
বিএনপি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামান্য একটি ভুল সিদ্ধান্ত তাদের মতো ঐতিহ্যবাহী দলকে রাজনৈতিক বিপর্যয়ে ফেলে দিতে পারে। এখনই তাদের উচিত—অভ্যন্তরীণ ঐক্য ফিরিয়ে আনা, তরুণ নেতৃত্ব তৈরি করা, এবং বাস্তব রাজনীতির মাঠে ফিরে আসা।