০১:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিতর্কিত বক্তব্যে ওয়ায়েজীদের নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর কড়া সতর্কবার্তা

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:১২:১৫ পূর্বাহ্ন, রোববার, ৫ অক্টোবর ২০২৫
  • ৩০৪০ বার পঠিত হয়েছে

মোঃ শাহজাহান বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
বিতর্কিত বক্তব্যের জেরে জামায়াতে ইসলামী ঘরানার কয়েকজন ওয়ায়েজীকে দলীয় পর্যায়ে ডেকে সতর্ক করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা মুফতি আমির হামজা ও তারেক মনোয়ারের বক্তব্য ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হওয়ার পর শনিবার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে ‘বিশিষ্ট দাঈ ও ওয়ায়েজ সম্মেলন’-এর আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামী।

সারাদেশ থেকে শতাধিক ওয়ায়েজ ও ইসলামিক বক্তা অংশ নেন এই সম্মেলনে। সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি মাওলানা আবদুল হালিম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।

এছাড়া বক্তব্য দেন মাওলানা যাইনুল আবেদীন, মাওলানা সাইয়েদ কামাল উদ্দিন জাফরী ও মাওলানা আব্দুল হামিদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও উলামা বিভাগীয় কমিটির সেক্রেটারি ড. মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী।

সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ওয়ায়েজ ও দাঈদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন,
“আপনারা আল্লাহর পথে দাওয়াত দেন, তাই আপনাদের বিনয়ী হতে হবে। বাহাস বা আত্মঘাতী বিতর্কে না গিয়ে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের পথে আহ্বান জানাতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা দায়িত্বশীল, এবং এই দায়িত্বের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ময়দানে এমন কোনো বক্তব্য দেওয়া যাবে না যাতে সমাজে বিভ্রান্তি বা বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে কথা বলতে হবে।”

তিনি আরও বলেন,
“জাতিকে জাগ্রত করার দায়িত্ব আপনাদের ওপরই। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী হয়ে ইসলামের শাশ্বত দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা— যা জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণে শিক্ষা দেয়। আমাদের সকল কাজেই মানবতার কল্যাণই প্রধান উদ্দেশ্য হতে হবে।”

বাংলাদেশের সামাজিক সম্প্রীতির কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন,
“বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। আমরা ধর্মের ভিত্তিতে জাতিকে বিভক্ত করার পক্ষে নই। দেশের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ মুসলমান, তাই ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ পরিচালনা করা গেলে দেশ কল্যাণের পথে এগিয়ে যাবে।”

তিনি বলেন,
“যারা মসজিদে নামাজে নেতৃত্ব দেন, তাদের সমাজের ভালো কাজেও নেতৃত্ব দিতে হবে। যখন ওলামায়ে কেরাম জাতির নেতৃত্বে আসবেন, তখনই একটি কল্যাণমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে, ইনশাআল্লাহ।”

ইসলামী শক্তির ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে জামায়াত আমির আরও বলেন,
“ইসলামী দল ও শক্তির ঐক্য এখন সময়ের দাবি। বিভেদ বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এমন কোনো বক্তব্য থেকে বিরত থাকতে হবে। ঐক্য বিনষ্ট না করে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”

উল্লেখ্য, সম্প্রতি কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য প্রার্থী মুফতি আমির হামজা এবং জামায়াত ঘরানার জনপ্রিয় বক্তা তারেক মনোয়ারের কিছু বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।

এ বিষয়ে তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. মুহাম্মাদ খলিলুর রহমান মাদানী ঢাকা মেইল-কে বলেন,
“ইসলাম বিতর্ককে সমর্থন করে না। ওয়ায়েজী বা বক্তারা এমন কোনো বক্তব্য দেবেন না যাতে বিশৃঙ্খলা বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। এসব বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি, এমনকি তারা ইতোমধ্যে ক্ষমাও চেয়েছেন। বিষয়টি সাংগঠনিকভাবে দেখা হচ্ছে।”

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মনে করছে, দাওয়াত ও ওয়ায়েজ কার্যক্রম ইসলামের সৌন্দর্য ও আহ্বানমূলক দিক তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই মঞ্চ বা মাইকে কোনো বিতর্কমূলক, উস্কানিমূলক বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য যেন দলীয় ভাবমূর্তি ও ইসলামী দাওয়াতের শুদ্ধতার পথে বাধা না হয়— সে বিষয়ে কঠোরভাবে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান-শাহসূফি ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল-হাসানী

বিতর্কিত বক্তব্যে ওয়ায়েজীদের নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর কড়া সতর্কবার্তা

Update Time : ১০:১২:১৫ পূর্বাহ্ন, রোববার, ৫ অক্টোবর ২০২৫

মোঃ শাহজাহান বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
বিতর্কিত বক্তব্যের জেরে জামায়াতে ইসলামী ঘরানার কয়েকজন ওয়ায়েজীকে দলীয় পর্যায়ে ডেকে সতর্ক করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা মুফতি আমির হামজা ও তারেক মনোয়ারের বক্তব্য ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হওয়ার পর শনিবার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে ‘বিশিষ্ট দাঈ ও ওয়ায়েজ সম্মেলন’-এর আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামী।

সারাদেশ থেকে শতাধিক ওয়ায়েজ ও ইসলামিক বক্তা অংশ নেন এই সম্মেলনে। সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি মাওলানা আবদুল হালিম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।

এছাড়া বক্তব্য দেন মাওলানা যাইনুল আবেদীন, মাওলানা সাইয়েদ কামাল উদ্দিন জাফরী ও মাওলানা আব্দুল হামিদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও উলামা বিভাগীয় কমিটির সেক্রেটারি ড. মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী।

সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ওয়ায়েজ ও দাঈদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন,
“আপনারা আল্লাহর পথে দাওয়াত দেন, তাই আপনাদের বিনয়ী হতে হবে। বাহাস বা আত্মঘাতী বিতর্কে না গিয়ে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের পথে আহ্বান জানাতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা দায়িত্বশীল, এবং এই দায়িত্বের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ময়দানে এমন কোনো বক্তব্য দেওয়া যাবে না যাতে সমাজে বিভ্রান্তি বা বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে কথা বলতে হবে।”

তিনি আরও বলেন,
“জাতিকে জাগ্রত করার দায়িত্ব আপনাদের ওপরই। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী হয়ে ইসলামের শাশ্বত দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা— যা জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণে শিক্ষা দেয়। আমাদের সকল কাজেই মানবতার কল্যাণই প্রধান উদ্দেশ্য হতে হবে।”

বাংলাদেশের সামাজিক সম্প্রীতির কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন,
“বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। আমরা ধর্মের ভিত্তিতে জাতিকে বিভক্ত করার পক্ষে নই। দেশের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ মুসলমান, তাই ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ পরিচালনা করা গেলে দেশ কল্যাণের পথে এগিয়ে যাবে।”

তিনি বলেন,
“যারা মসজিদে নামাজে নেতৃত্ব দেন, তাদের সমাজের ভালো কাজেও নেতৃত্ব দিতে হবে। যখন ওলামায়ে কেরাম জাতির নেতৃত্বে আসবেন, তখনই একটি কল্যাণমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে, ইনশাআল্লাহ।”

ইসলামী শক্তির ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে জামায়াত আমির আরও বলেন,
“ইসলামী দল ও শক্তির ঐক্য এখন সময়ের দাবি। বিভেদ বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এমন কোনো বক্তব্য থেকে বিরত থাকতে হবে। ঐক্য বিনষ্ট না করে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”

উল্লেখ্য, সম্প্রতি কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য প্রার্থী মুফতি আমির হামজা এবং জামায়াত ঘরানার জনপ্রিয় বক্তা তারেক মনোয়ারের কিছু বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।

এ বিষয়ে তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. মুহাম্মাদ খলিলুর রহমান মাদানী ঢাকা মেইল-কে বলেন,
“ইসলাম বিতর্ককে সমর্থন করে না। ওয়ায়েজী বা বক্তারা এমন কোনো বক্তব্য দেবেন না যাতে বিশৃঙ্খলা বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। এসব বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি, এমনকি তারা ইতোমধ্যে ক্ষমাও চেয়েছেন। বিষয়টি সাংগঠনিকভাবে দেখা হচ্ছে।”

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মনে করছে, দাওয়াত ও ওয়ায়েজ কার্যক্রম ইসলামের সৌন্দর্য ও আহ্বানমূলক দিক তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই মঞ্চ বা মাইকে কোনো বিতর্কমূলক, উস্কানিমূলক বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য যেন দলীয় ভাবমূর্তি ও ইসলামী দাওয়াতের শুদ্ধতার পথে বাধা না হয়— সে বিষয়ে কঠোরভাবে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।