
মোঃ শাহজাহান বাশার
সময়ের ভিড়ে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা আলো ছড়ান শব্দ করে নয়—অবিচল অবস্থান দিয়ে। তাঁদের শক্তি চিৎকারে নয়, নীরব সাহসে। মতিউর রহমান চৌধুরী তেমনই একজন মানুষ, তেমনই একজন সাংবাদিক—যাঁর জীবন ও কর্ম একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক আলাদা অধ্যায়।
তিনি এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যাঁদের কাছে সাংবাদিকতা ছিল সুবিধা নয়, ছিল সংগ্রাম। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ তাঁর জীবনের কেবল একটি অধ্যায় নয়—এটি তাঁর মানসগঠনের ভিত্তি। মৌলভীবাজারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে ভেঙে দেয়নি, বরং গড়ে তুলেছে। সেই নির্যাতন তাঁকে শিখিয়েছে—অন্যায়ের কাছে মাথা নত করলে ইতিহাস ক্ষমা করে না।
এই উপলব্ধিই তাঁকে আজীবন সত্যের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দেখেছেন ক্ষমতার রূপ বদলায়, সরকার বদলায়, কিন্তু নিপীড়ন প্রায় একই থাকে। আর ঠিক সেই জায়গাতেই তাঁর সাংবাদিকতা হয়ে ওঠে প্রাসঙ্গিক। দৈনিক মানবজমিন তাঁর হাত ধরে কেবল একটি সংবাদপত্র হিসেবে নয়, একটি অবস্থান হিসেবে জন্ম নেয়। মানবজমিন সাহস করে এমন সব প্রশ্ন তোলে, যেগুলো অনেকেই মনে মনে ভাবেন, কিন্তু উচ্চারণ করতে ভয় পান।
মানবজমিনে সংবাদ মানে শুধু তথ্য নয়—মানবিকতা। সেখানে রাষ্ট্রের শক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের কান্না জায়গা পায়। সেখানে ক্ষমতার গ্ল্যামার ভেঙে দেখা হয় বাস্তবতা। এই নির্ভীক দৃষ্টিভঙ্গিই মানবজমিনকে পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতায়ও মতিউর রহমান চৌধুরীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগে কাজ করার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন সততা ও ভারসাম্যের সঙ্গে। এখানেও তিনি কোনো পক্ষের মুখপাত্র হননি—তিনি ছিলেন সত্যের প্রতিনিধি।
এর আগে বাংলাবাজার পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল সাহসী ও দূরদর্শী। সেই সময়ও তিনি দেখিয়েছেন—সংবাদপত্রের কাজ শুধু ছাপা নয়, দিকনির্দেশনা দেওয়া।
টক-শো উপস্থাপনায় তাঁর উপস্থিতি ছিল আলাদা। তিনি উত্তেজনা তৈরি করতেন না, বরং চিন্তা তৈরি করতেন। তাঁর প্রশ্নগুলো ছিল সরল, কিন্তু গভীর। তিনি কাউকে অপমান করতেন না, কিন্তু কাউকেই ছাড় দিতেন না। এই সংযত দৃঢ়তাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
ব্যক্তিগত জীবনে মতিউর রহমান চৌধুরী প্রচারবিমুখ, শান্ত ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন একজন মানুষ। সহধর্মিণী মাহবুবা চৌধুরী এবং কন্যা মেহজেব চৌধুরী তাঁর জীবনের নীরব শক্তি। পরিবার ও পেশার এই ভারসাম্যই হয়তো তাঁকে দীর্ঘদিন অবিচল থাকতে সাহায্য করেছে।
আনন্দ আলো পুরস্কার তাঁর জীবনের অসংখ্য অর্জনের একটি প্রতীক মাত্র। প্রকৃত পুরস্কার তিনি পেয়েছেন পাঠকের বিশ্বাসে, সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় এবং তরুণ সাংবাদিকদের শ্রদ্ধায়।
একজন কর্মরত সাংবাদিক হিসেবে, একজন ভক্ত হিসেবে আমরা যখন তাঁর কর্মজীবনের দিকে তাকাই, তখন বুঝতে পারি—সাংবাদিকতা মানে দ্রুত ভাইরাল হওয়া নয়,সাংবাদিকতা মানে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা নয়,
সাংবাদিকতা মানে সময়ের কাছে দায়বদ্ধ থাকা।
মতিউর রহমান চৌধুরী আমাদের শিখিয়েছেন—কলম যদি সৎ হয়, তবে সেটাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
নীরব থাকলেও অবস্থান স্পষ্ট রাখা যায়।আর সত্যের পথে হাঁটলে একা হলেও ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
এই কারণেই তিনি কেবল একজন সম্পাদক নন,তিনি একটি প্রজন্মের বিবেক, তিনি সাংবাদিকতার এক শান্ত কিন্তু অটল বাতিঘর।

Reporter Name 

















