০৭:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
এক চিলতে আশ্রয়ের খোঁজে জীবনের সায়াহ্নে এক বৃদ্ধার করুন আকুতি; সাড়া দেবে কি কেউ?

বাজান, এই ঘরটা আমারে কিনে দেন”—ভিক্ষুক রোকেয়ার শেষ আশ্রয়ের হৃদয়বিদারক আর্তি।

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:২৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, রোববার, ১১ জানুয়ারি ২০২৬
  • ৩০৫৫ বার পঠিত হয়েছে

বিশ্বজিৎ চন্দ্র সরকার, জেলা প্রতিনিধি, গোপালগঞ্জ:“বাজান, এই ঘরটা আমারে কিনে দেন। আমি ভিক্ষা কইরা চাইয়া আইনা কহানে বসে খামু, কহানে বসে নামাজ পড়মু। এই ঘরটাই আমারে কিনে দেন বাবা।”

কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে এভাবেই নিজের শেষ আশ্রয়ের জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন ৭৫ বছর বয়সী ভিক্ষুক রোকেয়া বেগম। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি ২০২৬) গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া ইউনিয়নের পার ঝনঝনিয়া গ্রামে সাংবাদিকদের সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের অসহায় জীবনের করুণ বাস্তবতা তুলে ধরেন তিনি।

কান্না থামাতে থামাতে রোকেয়া বেগম বলেন, “দুঃখের আর সীমা নাই বাজান। একটু থাকার জায়গা চাই। একটা মাইয়াও যদি থাকতো, এইভাবে থাকতে হতো না। আমার একমাত্র ছেলেটা হাসপাতালে ভর্তি—লিভারে পানি জমছে, অপারেশন লাগবো। টাহা নাই, কী দিয়া চিকিৎসা করমু?”—বলতে বলতে থেমে যান তিনি। চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, “একটু আগে ফোন দিছে মা, আমি বড় বিপদে। আমার লইগা দোয়া কইরেন।”

রোকেয়া বেগমের অভিযোগ, সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরে থাকার জন্য তার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে না পারায় নামাজরত অবস্থাতেই তাকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। তিনি বলেন, “ফজরের নামাজের পর এশরাক নামাজ পড়তেছিলাম, সেই সময় ঘরের লোকজন আমারে ঘর থিকা নামাই দিছে।” এক মুহূর্তেই মাথার ওপর থেকে শেষ আশ্রয়টুকু হারান এই বৃদ্ধা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৬–১৮ বছর আগে রোকেয়া বেগমের স্বামী সুলতান শেখ মারা যাওয়ার পর থেকেই তার একাকী সংগ্রাম শুরু। স্বামীর রেখে যাওয়া এক কাঠা জমিই ছিল তার শেষ সম্বল। অভাবের তাড়নায় সেটিও বিক্রি করতে বাধ্য হন। পরে নৌকা কিনে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করলেও দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি—নৌকাটি নদীতে ডুবে যায়। এরপর থেকেই মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করেই তার জীবনযাপন।

রোকেয়ার অসহায়ত্ব দেখে এগিয়ে আসেন স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ শেখ ও তার স্ত্রী খালেদা বেগম। আপাতত তারা তাকে নিজেদের ঘরে আশ্রয় দিয়েছেন। খালেদা বেগম বলেন, “ওনাকে ঘর থেকে নামাই দিছে শুনে এসে দেখি কান্নাকাটি করছে। তখন বলছি—আমার ছেলে-বউ বাড়িতে নাই, আপাতত তুমি আমার ঘরেই থাকো। তিন-চার মাস ধরে আছেন। কিন্তু আমরাও গরিব মানুষ, স্থায়ীভাবে রাখা আমাদের পক্ষে সম্ভব না।”

এদিকে বাঁশবাড়িয়া চৌরঙ্গী মোড় এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের নামে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে নেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ নিশ্চিত করা।

ডুমুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজাম শেখ বলেন, “বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখব। উনি যদি প্রকৃতপক্ষে অসহায় মানুষ হন, তাহলে ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এ বিষয়ে টুঙ্গিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহিরুল আলম বলেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর কোনোভাবেই বিক্রি বা অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তরের সুযোগ নেই। ভিক্ষুক রোকেয়া বেগমের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শীতের এই কনকনে দিনে বৃদ্ধা রোকেয়া বেগম এরপর কোথায় যাবেন—এই প্রশ্নই এখন এলাকাবাসীর বিবেককে নাড়িয়ে দিচ্ছে। মাত্র ২০ হাজার টাকার অভাবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কি তার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা সম্ভব নয়? নাকি আশ্রয়ণ প্রকল্প আজও তার মতো অসহায়দের নাগালের বাইরে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে এক টুকরো ছাদের আশায় তাকিয়ে আছেন রোকেয়া বেগম।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

রংপুরে মোট্রোঃ ডিবি’র পতিতাবৃত্তি প্রতিরোধ অভিযানে ৪ নারীসহ গ্রেফতার-১৩

এক চিলতে আশ্রয়ের খোঁজে জীবনের সায়াহ্নে এক বৃদ্ধার করুন আকুতি; সাড়া দেবে কি কেউ?

বাজান, এই ঘরটা আমারে কিনে দেন”—ভিক্ষুক রোকেয়ার শেষ আশ্রয়ের হৃদয়বিদারক আর্তি।

Update Time : ১২:২৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, রোববার, ১১ জানুয়ারি ২০২৬

বিশ্বজিৎ চন্দ্র সরকার, জেলা প্রতিনিধি, গোপালগঞ্জ:“বাজান, এই ঘরটা আমারে কিনে দেন। আমি ভিক্ষা কইরা চাইয়া আইনা কহানে বসে খামু, কহানে বসে নামাজ পড়মু। এই ঘরটাই আমারে কিনে দেন বাবা।”

কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে এভাবেই নিজের শেষ আশ্রয়ের জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন ৭৫ বছর বয়সী ভিক্ষুক রোকেয়া বেগম। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি ২০২৬) গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া ইউনিয়নের পার ঝনঝনিয়া গ্রামে সাংবাদিকদের সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের অসহায় জীবনের করুণ বাস্তবতা তুলে ধরেন তিনি।

কান্না থামাতে থামাতে রোকেয়া বেগম বলেন, “দুঃখের আর সীমা নাই বাজান। একটু থাকার জায়গা চাই। একটা মাইয়াও যদি থাকতো, এইভাবে থাকতে হতো না। আমার একমাত্র ছেলেটা হাসপাতালে ভর্তি—লিভারে পানি জমছে, অপারেশন লাগবো। টাহা নাই, কী দিয়া চিকিৎসা করমু?”—বলতে বলতে থেমে যান তিনি। চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, “একটু আগে ফোন দিছে মা, আমি বড় বিপদে। আমার লইগা দোয়া কইরেন।”

রোকেয়া বেগমের অভিযোগ, সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরে থাকার জন্য তার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে না পারায় নামাজরত অবস্থাতেই তাকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। তিনি বলেন, “ফজরের নামাজের পর এশরাক নামাজ পড়তেছিলাম, সেই সময় ঘরের লোকজন আমারে ঘর থিকা নামাই দিছে।” এক মুহূর্তেই মাথার ওপর থেকে শেষ আশ্রয়টুকু হারান এই বৃদ্ধা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৬–১৮ বছর আগে রোকেয়া বেগমের স্বামী সুলতান শেখ মারা যাওয়ার পর থেকেই তার একাকী সংগ্রাম শুরু। স্বামীর রেখে যাওয়া এক কাঠা জমিই ছিল তার শেষ সম্বল। অভাবের তাড়নায় সেটিও বিক্রি করতে বাধ্য হন। পরে নৌকা কিনে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করলেও দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি—নৌকাটি নদীতে ডুবে যায়। এরপর থেকেই মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করেই তার জীবনযাপন।

রোকেয়ার অসহায়ত্ব দেখে এগিয়ে আসেন স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ শেখ ও তার স্ত্রী খালেদা বেগম। আপাতত তারা তাকে নিজেদের ঘরে আশ্রয় দিয়েছেন। খালেদা বেগম বলেন, “ওনাকে ঘর থেকে নামাই দিছে শুনে এসে দেখি কান্নাকাটি করছে। তখন বলছি—আমার ছেলে-বউ বাড়িতে নাই, আপাতত তুমি আমার ঘরেই থাকো। তিন-চার মাস ধরে আছেন। কিন্তু আমরাও গরিব মানুষ, স্থায়ীভাবে রাখা আমাদের পক্ষে সম্ভব না।”

এদিকে বাঁশবাড়িয়া চৌরঙ্গী মোড় এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের নামে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে নেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ নিশ্চিত করা।

ডুমুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজাম শেখ বলেন, “বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখব। উনি যদি প্রকৃতপক্ষে অসহায় মানুষ হন, তাহলে ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এ বিষয়ে টুঙ্গিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহিরুল আলম বলেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর কোনোভাবেই বিক্রি বা অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তরের সুযোগ নেই। ভিক্ষুক রোকেয়া বেগমের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শীতের এই কনকনে দিনে বৃদ্ধা রোকেয়া বেগম এরপর কোথায় যাবেন—এই প্রশ্নই এখন এলাকাবাসীর বিবেককে নাড়িয়ে দিচ্ছে। মাত্র ২০ হাজার টাকার অভাবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কি তার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা সম্ভব নয়? নাকি আশ্রয়ণ প্রকল্প আজও তার মতো অসহায়দের নাগালের বাইরে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে এক টুকরো ছাদের আশায় তাকিয়ে আছেন রোকেয়া বেগম।