০৯:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রিপেইড মিটার স্থাপন বন্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৮:৪২:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬
  • ৩০৩৫ বার পঠিত হয়েছে

আবুল হোসেন বাবলুঃ

বিদ্যুৎ খাতে গ্রাহক শোষণ ও হয়রানির প্রিপেইড মিটার বাতিলের দাবিতে আজ বেলা ১২ টায় স্থানীয় সুমি কমিউনিটি সেন্টারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর খোলাচিঠি প্রেরণ প্রসঙ্গে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর প্রেরিত খোলা চিঠি পাঠ করেন, রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব এডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন, কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নীপেন্দ্র নাথ রায়,আব্দুল জব্বার,এবিএম মসিউর রহমান, বিজয় প্রসাদ তপু, আব্দুল হামিদ বাবু, আমিন মোর্শেদ, সুবাস রায়, সবুজ রায়, ফিরোজ চৌধুরী, মাহফুজার রহমান, আশিক চন্ডাল প্রমুখ।

প্রধানমন্ত্রী বরাবর প্রেরিত খোলা চিঠিতে বলা হয়- জুলাই অভ্যুত্থানে দেশের সাধারণ মানুষ একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিল। সেই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রীয় সেবা খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও লুটপাটের অবসান ঘটানো এবং জনগণের মতামত ও অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। তারই ধারাবাহিকতায় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ আপনার দলের হাতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে দায়িত্বভার অর্পণ করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিদ্যুৎ খাতে প্রিপেইড মিটার স্থাপনের সাম্প্রতিক কার্যক্রম জনগণের সেই প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি, সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও বিদ্যুৎ বিভাগ সারাদেশের বাসা-বাড়ি, অফিস- আদালত ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে জবরদস্তিমূলকভাবে প্রিপেইড মিটার স্থাপন অব্যাহত রেখেছে। প্রতিদিনই প্রিপেইড মিটার সম্পর্কে গ্রাহকদের অসন্তোষ ও বিক্ষোভের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় ক্রমেই একটি সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের ভাষ্যমতে বিদ্যুৎ খাতে চুরি, অপচয়, ওভারলোড ও বকেয়া বিল ঠেকাতে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যর্থতার দায় গ্রাহকদের কাঁধে চাপিয়ে প্রকারান্তরে জনগণের পকেট লুণ্ঠন ও চরম ভোগান্তির সৃষ্টি করা হয়েছে।বর্তমানে সারাদেশে একযোগে পিডিবি, আরইবি, নেসকো, ডিপিডিসি, ডেসকো ও ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি প্রিপেইড মিটার স্থাপনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পূর্বে বিদ্যুৎ বিভাগের গ্রাহকদের মতামত গ্রহণ কিংবা একটি গণশুনানীর আয়োজন করা উচিত ছিল। কিন্তু জনমতের তোয়াক্কা না করে একতরফাভাবে বিদ্যুৎ বিভাগ তাদের সিদ্ধান্ত বিদ্যুৎ গ্রাহকদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। প্রিপেইড মিটার পদ্ধতিতে গ্রাহকদের আগাম টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ ক্রয় করতে হবে এবং যতক্ষণ প্রিপেইড কার্ডে টাকা থাকবে ততক্ষণ গ্রাহক বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারবে। যা একটি সেবামূলক খাতের মৌলিক ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক।

বিদ্যুৎ আইন ২০১৮ এর ৫৬ ধারা অনুযায়ী গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হলে কোম্পানিকে ১৫ দিন পূর্বে নোটিশ দিতে হয়। কিন্তু প্রিপেইড মিটার পদ্ধতিতে কার্ডে রিচার্জকৃত টাকা শেষ হওয়ার সাথে সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যা বিদ্যুৎ আইনের পরিপন্থী। বর্তমানে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে গ্রাহক শোষণ ও হয়রানিমূলক প্রিপেইড মিটার স্থাপন বন্ধে একটি রিট পিটিশন বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু সেই রিট নিষ্পত্তির পূর্বেই বিদ্যুৎ বিভাগ তড়িঘড়ি করে প্রিপেইড মিটার স্থাপনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই প্রিপেইড মিটার সংযোগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। এই প্রিপেইড মিটার বাণিজ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু’র ভাই-বন্ধু হিসেবে পরিচিত একটি চক্রের হাতে। অভিযোগ রয়েছে, সেই চক্রটি এখনও সক্রিয় রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিগত ১৫ বছরে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে।এমনকি স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের নামে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রায় ৫ শত কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে।

বিতর্কিত এই প্রিপেইড মিটারে গ্রাহকদের মিটার ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে ৪০ টাকা, ডিমান্ড চার্জ বাবদ (প্রতি কিলোওয়াট) ৩০ টাকা, ভ্যাট শতকরা ৫ টাকা এবং রিবেট শতকরা ১ টাকা হারে পরিশোধ করতে হয়। প্রিপেইড মিটার পদ্ধতিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইউনিট প্রতি চার্জ পেয়ে থাকে, ফলে অতিরিক্ত চার্জ আদায়ের সুযোগ নেই। তবুও অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা হচ্ছে। এছাড়াও প্রতিবার ১ হাজার টাকা রিচার্জে এজেন্ট কমিশন বাবদ ২০ টাকা গুনতে হয়।

গ্রাহকদের টাকায় ক্রয়কৃত মিটার হওয়া সত্ত্বেও সেই মিটারের জন্য প্রতি মাসে ৪০ টাকা করে কতদিন ভাড়া আদায় করা হবে সেটিও অস্পষ্ট। আবার গ্রাহকরা নিজেদের টাকায় পূর্বে যে ডিজিটাল মিটার ক্রয় করেছিলেন সেটি বাতিল করা হলেও তার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ কোনো ক্ষতিপূরণ প্রদান করেনি। প্রতি ১ হাজার টাকা রিচার্জে গ্রাহকরা কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারবেন কিংবা আবাসিক ও বাণিজ্যিক রেট কিভাবে নির্ধারিত হবে সে সম্পর্কেও সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

প্রিপেইড মিটারে ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলে ২০০ টাকা ইমার্জেন্সি ব্যালেন্সের জন্য ৫০ টাকা হারে গ্রাহকদের সুদ পরিশোধ করতে হয়। কোনো কারণে প্রিপেইড মিটার লক হয়ে গেলে সেটি চালু করতে ৬০০ টাকা জমা দিতে হয়। বিদ্যুতের ওভারলোডের কারণে অনেক সময় বিদ্যুৎ প্রবাহ আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়াও রিচার্জ করার সাথে সাথে টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু এসব বিষয়ে গ্রাহকরা অভিযোগ করেও কোনো কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছেন না।

বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলে প্রিপেইড মিটার রিচার্জ করা সম্ভব হয় না। কৃষিকাজে ব্যবহৃত সেচ পাম্পগুলোতে কৃষকরা মৌসুমের শুরুতে বাকিতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ফসল বিক্রির পর সেই টাকা পরিশোধ করতেন। কিন্তু প্রিপেইড মিটার পদ্ধতিতে সেই সুযোগও আর থাকছে না। পাশাপাশি প্রিপেইড মিটার স্থাপনের ফলে বিদ্যুৎ বিভাগের হাজার হাজার কর্মচারীর চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই পদ্ধতিতে কোনো কারণে সার্ভার ডাউন হলে সংশ্লিষ্ট সার্ভারের আওতাধীন গ্রাহকদের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে সার্ভার সচল না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহকদের অন্ধকারে থাকতে হবে। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে দফায় দফায় বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছিল। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই বেসরকারি কোম্পানিগুলো গত ১০ বছরে প্রায় ৫১ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে নিয়ে গেছে। যার খেসারত দিতে হয়েছে সাধারণ জনগণকে।

খোলাচিঠিতে আরও বলা হয়- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সারাদেশের সকল মানুষকে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবার আওতায় নিয়ে আসা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু তার পরিবর্তে একের পর এক গণবিরোধী সিদ্ধান্ত জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সারাদেশের কোটি কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহকের স্বার্থ উপেক্ষা করে কার স্বার্থে এই হয়রানি ও লুটপাটের প্রিপেইড মিটার প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ বিভাগ মরিয়া হয়ে উঠেছে-এ প্রশ্ন আজ সর্বস্তরের মানুষের।

খোলাচিঠিতে-বিতর্কিত প্রিপেইড মিটার স্থাপন কার্যক্রম স্থগিত করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা এবং গ্রাহকদের মতামত গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের কথা ব্যক্ত করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে অবিলম্বে বির্তকিত প্রিপেইড মিটার বাতিল করা না হলে লাগাতার আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেছেন রংপুরে নবনিযুক্ত পুলিশ সুপার

প্রিপেইড মিটার স্থাপন বন্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

Update Time : ০৮:৪২:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬

আবুল হোসেন বাবলুঃ

বিদ্যুৎ খাতে গ্রাহক শোষণ ও হয়রানির প্রিপেইড মিটার বাতিলের দাবিতে আজ বেলা ১২ টায় স্থানীয় সুমি কমিউনিটি সেন্টারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর খোলাচিঠি প্রেরণ প্রসঙ্গে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর প্রেরিত খোলা চিঠি পাঠ করেন, রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব এডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন, কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নীপেন্দ্র নাথ রায়,আব্দুল জব্বার,এবিএম মসিউর রহমান, বিজয় প্রসাদ তপু, আব্দুল হামিদ বাবু, আমিন মোর্শেদ, সুবাস রায়, সবুজ রায়, ফিরোজ চৌধুরী, মাহফুজার রহমান, আশিক চন্ডাল প্রমুখ।

প্রধানমন্ত্রী বরাবর প্রেরিত খোলা চিঠিতে বলা হয়- জুলাই অভ্যুত্থানে দেশের সাধারণ মানুষ একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিল। সেই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রীয় সেবা খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও লুটপাটের অবসান ঘটানো এবং জনগণের মতামত ও অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। তারই ধারাবাহিকতায় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ আপনার দলের হাতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে দায়িত্বভার অর্পণ করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিদ্যুৎ খাতে প্রিপেইড মিটার স্থাপনের সাম্প্রতিক কার্যক্রম জনগণের সেই প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি, সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও বিদ্যুৎ বিভাগ সারাদেশের বাসা-বাড়ি, অফিস- আদালত ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে জবরদস্তিমূলকভাবে প্রিপেইড মিটার স্থাপন অব্যাহত রেখেছে। প্রতিদিনই প্রিপেইড মিটার সম্পর্কে গ্রাহকদের অসন্তোষ ও বিক্ষোভের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় ক্রমেই একটি সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের ভাষ্যমতে বিদ্যুৎ খাতে চুরি, অপচয়, ওভারলোড ও বকেয়া বিল ঠেকাতে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যর্থতার দায় গ্রাহকদের কাঁধে চাপিয়ে প্রকারান্তরে জনগণের পকেট লুণ্ঠন ও চরম ভোগান্তির সৃষ্টি করা হয়েছে।বর্তমানে সারাদেশে একযোগে পিডিবি, আরইবি, নেসকো, ডিপিডিসি, ডেসকো ও ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি প্রিপেইড মিটার স্থাপনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পূর্বে বিদ্যুৎ বিভাগের গ্রাহকদের মতামত গ্রহণ কিংবা একটি গণশুনানীর আয়োজন করা উচিত ছিল। কিন্তু জনমতের তোয়াক্কা না করে একতরফাভাবে বিদ্যুৎ বিভাগ তাদের সিদ্ধান্ত বিদ্যুৎ গ্রাহকদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। প্রিপেইড মিটার পদ্ধতিতে গ্রাহকদের আগাম টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ ক্রয় করতে হবে এবং যতক্ষণ প্রিপেইড কার্ডে টাকা থাকবে ততক্ষণ গ্রাহক বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারবে। যা একটি সেবামূলক খাতের মৌলিক ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক।

বিদ্যুৎ আইন ২০১৮ এর ৫৬ ধারা অনুযায়ী গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হলে কোম্পানিকে ১৫ দিন পূর্বে নোটিশ দিতে হয়। কিন্তু প্রিপেইড মিটার পদ্ধতিতে কার্ডে রিচার্জকৃত টাকা শেষ হওয়ার সাথে সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যা বিদ্যুৎ আইনের পরিপন্থী। বর্তমানে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে গ্রাহক শোষণ ও হয়রানিমূলক প্রিপেইড মিটার স্থাপন বন্ধে একটি রিট পিটিশন বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু সেই রিট নিষ্পত্তির পূর্বেই বিদ্যুৎ বিভাগ তড়িঘড়ি করে প্রিপেইড মিটার স্থাপনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই প্রিপেইড মিটার সংযোগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। এই প্রিপেইড মিটার বাণিজ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু’র ভাই-বন্ধু হিসেবে পরিচিত একটি চক্রের হাতে। অভিযোগ রয়েছে, সেই চক্রটি এখনও সক্রিয় রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিগত ১৫ বছরে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে।এমনকি স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের নামে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রায় ৫ শত কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে।

বিতর্কিত এই প্রিপেইড মিটারে গ্রাহকদের মিটার ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে ৪০ টাকা, ডিমান্ড চার্জ বাবদ (প্রতি কিলোওয়াট) ৩০ টাকা, ভ্যাট শতকরা ৫ টাকা এবং রিবেট শতকরা ১ টাকা হারে পরিশোধ করতে হয়। প্রিপেইড মিটার পদ্ধতিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইউনিট প্রতি চার্জ পেয়ে থাকে, ফলে অতিরিক্ত চার্জ আদায়ের সুযোগ নেই। তবুও অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা হচ্ছে। এছাড়াও প্রতিবার ১ হাজার টাকা রিচার্জে এজেন্ট কমিশন বাবদ ২০ টাকা গুনতে হয়।

গ্রাহকদের টাকায় ক্রয়কৃত মিটার হওয়া সত্ত্বেও সেই মিটারের জন্য প্রতি মাসে ৪০ টাকা করে কতদিন ভাড়া আদায় করা হবে সেটিও অস্পষ্ট। আবার গ্রাহকরা নিজেদের টাকায় পূর্বে যে ডিজিটাল মিটার ক্রয় করেছিলেন সেটি বাতিল করা হলেও তার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ কোনো ক্ষতিপূরণ প্রদান করেনি। প্রতি ১ হাজার টাকা রিচার্জে গ্রাহকরা কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারবেন কিংবা আবাসিক ও বাণিজ্যিক রেট কিভাবে নির্ধারিত হবে সে সম্পর্কেও সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

প্রিপেইড মিটারে ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলে ২০০ টাকা ইমার্জেন্সি ব্যালেন্সের জন্য ৫০ টাকা হারে গ্রাহকদের সুদ পরিশোধ করতে হয়। কোনো কারণে প্রিপেইড মিটার লক হয়ে গেলে সেটি চালু করতে ৬০০ টাকা জমা দিতে হয়। বিদ্যুতের ওভারলোডের কারণে অনেক সময় বিদ্যুৎ প্রবাহ আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়াও রিচার্জ করার সাথে সাথে টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু এসব বিষয়ে গ্রাহকরা অভিযোগ করেও কোনো কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছেন না।

বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলে প্রিপেইড মিটার রিচার্জ করা সম্ভব হয় না। কৃষিকাজে ব্যবহৃত সেচ পাম্পগুলোতে কৃষকরা মৌসুমের শুরুতে বাকিতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ফসল বিক্রির পর সেই টাকা পরিশোধ করতেন। কিন্তু প্রিপেইড মিটার পদ্ধতিতে সেই সুযোগও আর থাকছে না। পাশাপাশি প্রিপেইড মিটার স্থাপনের ফলে বিদ্যুৎ বিভাগের হাজার হাজার কর্মচারীর চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই পদ্ধতিতে কোনো কারণে সার্ভার ডাউন হলে সংশ্লিষ্ট সার্ভারের আওতাধীন গ্রাহকদের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে সার্ভার সচল না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহকদের অন্ধকারে থাকতে হবে। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে দফায় দফায় বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছিল। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই বেসরকারি কোম্পানিগুলো গত ১০ বছরে প্রায় ৫১ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে নিয়ে গেছে। যার খেসারত দিতে হয়েছে সাধারণ জনগণকে।

খোলাচিঠিতে আরও বলা হয়- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সারাদেশের সকল মানুষকে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবার আওতায় নিয়ে আসা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু তার পরিবর্তে একের পর এক গণবিরোধী সিদ্ধান্ত জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সারাদেশের কোটি কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহকের স্বার্থ উপেক্ষা করে কার স্বার্থে এই হয়রানি ও লুটপাটের প্রিপেইড মিটার প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ বিভাগ মরিয়া হয়ে উঠেছে-এ প্রশ্ন আজ সর্বস্তরের মানুষের।

খোলাচিঠিতে-বিতর্কিত প্রিপেইড মিটার স্থাপন কার্যক্রম স্থগিত করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা এবং গ্রাহকদের মতামত গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের কথা ব্যক্ত করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে অবিলম্বে বির্তকিত প্রিপেইড মিটার বাতিল করা না হলে লাগাতার আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়।