০৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক টাকার দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারলে সংসদ থেকে ইস্তফা দেবেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:৫৬:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
  • ৩০২০ বার পঠিত হয়েছে

মোঃ শাহজাহান বাশার

এক টাকার দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারলে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করবেন—জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে এমন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। তবে তার নিজ নির্বাচনী এলাকায় একটি মসজিদ সংস্কার প্রকল্পকে ঘিরে সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কুমিল্লার দেবিদ্বার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের মরিচাকান্দা পূর্বপাড়া এলাকার বাইতুলফালা জামে মসজিদ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এলাকাবাসীর কাছে ভোট চাওয়ার সময় হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, নির্বাচিত হলে তিনি নিজের ব্যক্তিগত অর্থায়নে মসজিদটির সংস্কার কাজ সম্পন্ন করবেন। কিন্তু নির্বাচনের পর দীর্ঘ সময় সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। পরে তার ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে কিছু সংস্কার কাজ করা হলেও তা নিম্নমানের এবং প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় সরকারি বরাদ্দের সঙ্গে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিল ব্যক্তিগত অর্থ দিয়ে মসজিদের কাজ করা হবে। পরে জানতে পারেন, প্রকল্পের জন্য সরকারি বরাদ্দ এসেছে ১১ লাখ ৮১ হাজার টাকা। অথচ বাস্তবে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকার কাজ হয়েছে বলে তাদের ধারণা।

এলাকার এক তরুণ অভিযোগ করেন, সংসদ সদস্যের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করা হলেও কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের ছিল এবং বরাদ্দ অনুযায়ী কাজের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

মসজিদ কমিটির উপদেষ্টা সিরাজুল ইসলাম মিরণ বলেন, নির্বাচনের আগে তাদের জানানো হয়েছিল, ব্যক্তিগত অর্থে মসজিদের সংস্কার করা হবে। কিন্তু পরে জেলা প্রশাসকের এক সভায় তারা জানতে পারেন, বাইতুলফালা জামে মসজিদের নামে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ই-টেন্ডারের মাধ্যমে ১১ লাখ ৮১ হাজার টাকার সরকারি বরাদ্দ অনুমোদন হয়েছে।

তার ভাষায়, “আমাদের বলা হয়েছিল ব্যক্তিগতভাবে কাজটি করে দেওয়া হবে। পরে সরকারি বরাদ্দের তথ্য জানতে পেরে আমরা বিস্মিত হই। একজন ঠিকাদারের সঙ্গে পরামর্শ করে জানতে পেরেছি, যে কাজ হয়েছে তার ব্যয় সর্বোচ্চ তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা হতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “হাসনাত ভাই সবসময় নীতির কথা বলেন। কিন্তু যদি সত্যিই ১১-১২ লাখ টাকার সরকারি প্রকল্পে এত অল্প কাজ হয়ে থাকে, তাহলে এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত।”

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি অর্থে প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও মসজিদ কমিটিকে বরাদ্দ, প্রকল্প ব্যয় কিংবা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। ফলে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে প্রকল্পের ই-টেন্ডারে আবেদনকারী ইয়াহিয়া জানান, তিনি টেন্ডারে অংশ নিলেও প্রকল্পের মোট বরাদ্দ কত ছিল, সে বিষয়ে তাকে জানানো হয়নি।

তার দাবি, “বরাদ্দের পরিমাণ কিংবা প্রকল্পের কাগজপত্র আমাদের দেখানো হয়নি। জেলা পরিষদের কর্মকর্তারাই বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন।”

অন্যদিকে কার্যাদেশপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মমতাজ এন্টারপ্রাইজ-এর স্বত্বাধিকারী মো. ফরহাদুল মিজান জানান, তিনি কাজটি নিজে না করে সাব-ঠিকাদার বিল্লাল হোসেনকে দিয়ে বাস্তবায়ন করিয়েছেন।

তার বক্তব্য, “জেলা পরিষদের প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানেই কাজ হয়েছে। এখানে অনিয়ম হওয়ার কথা নয়।”

তবে বিল্লাল হোসেন জানান, তিনিও সরাসরি কাজ করেননি; বরং রিয়াদ নামের এক ব্যক্তির কাছে কাজটি হস্তান্তর করেন। রিয়াদ স্থানীয় এনসিপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিল্লাল আরও বলেন, “আমি কয়েক বছর ধরে সরাসরি কোনো কাজ করি না। ছোট ভাইদের মাধ্যমে কিছু কাজ হয়েছে।”

তবে কালের কণ্ঠের হাতে থাকা নথি অনুযায়ী, বিল্লালের দাবি থেকে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। নথিতে দেখা যায়, প্রকল্পের বাস্তবায়নের সঙ্গে বিল্লালের ছোট ভাই ইকবাল হোসেনের সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে।

এছাড়া স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিল্লাল হোসেন দেবিদ্বার ক্যাপ্টেন সুজাত আলী সরকারি কলেজের নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং জুলাই আন্দোলনের একটি হত্যা মামলার আসামি।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, সরকারি বরাদ্দের অর্থ নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা নয়ছয়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. গোলাম জাকারিয়া বলেন, “অভিযোগের বিষয়টি আমি নোট করেছি। তদন্ত করে যদি কোনো ধরনের অনিয়ম বা ব্যত্যয় পাওয়া যায়, তাহলে প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

সংবাদ প্রকাশের জবাব হামলা হতে পারে না- দৈনিক সরেজমিন এর সম্পাদক

এক টাকার দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারলে সংসদ থেকে ইস্তফা দেবেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।

Update Time : ১০:৫৬:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

মোঃ শাহজাহান বাশার

এক টাকার দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারলে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করবেন—জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে এমন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। তবে তার নিজ নির্বাচনী এলাকায় একটি মসজিদ সংস্কার প্রকল্পকে ঘিরে সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কুমিল্লার দেবিদ্বার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের মরিচাকান্দা পূর্বপাড়া এলাকার বাইতুলফালা জামে মসজিদ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এলাকাবাসীর কাছে ভোট চাওয়ার সময় হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, নির্বাচিত হলে তিনি নিজের ব্যক্তিগত অর্থায়নে মসজিদটির সংস্কার কাজ সম্পন্ন করবেন। কিন্তু নির্বাচনের পর দীর্ঘ সময় সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। পরে তার ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে কিছু সংস্কার কাজ করা হলেও তা নিম্নমানের এবং প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় সরকারি বরাদ্দের সঙ্গে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিল ব্যক্তিগত অর্থ দিয়ে মসজিদের কাজ করা হবে। পরে জানতে পারেন, প্রকল্পের জন্য সরকারি বরাদ্দ এসেছে ১১ লাখ ৮১ হাজার টাকা। অথচ বাস্তবে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকার কাজ হয়েছে বলে তাদের ধারণা।

এলাকার এক তরুণ অভিযোগ করেন, সংসদ সদস্যের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করা হলেও কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের ছিল এবং বরাদ্দ অনুযায়ী কাজের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

মসজিদ কমিটির উপদেষ্টা সিরাজুল ইসলাম মিরণ বলেন, নির্বাচনের আগে তাদের জানানো হয়েছিল, ব্যক্তিগত অর্থে মসজিদের সংস্কার করা হবে। কিন্তু পরে জেলা প্রশাসকের এক সভায় তারা জানতে পারেন, বাইতুলফালা জামে মসজিদের নামে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ই-টেন্ডারের মাধ্যমে ১১ লাখ ৮১ হাজার টাকার সরকারি বরাদ্দ অনুমোদন হয়েছে।

তার ভাষায়, “আমাদের বলা হয়েছিল ব্যক্তিগতভাবে কাজটি করে দেওয়া হবে। পরে সরকারি বরাদ্দের তথ্য জানতে পেরে আমরা বিস্মিত হই। একজন ঠিকাদারের সঙ্গে পরামর্শ করে জানতে পেরেছি, যে কাজ হয়েছে তার ব্যয় সর্বোচ্চ তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা হতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “হাসনাত ভাই সবসময় নীতির কথা বলেন। কিন্তু যদি সত্যিই ১১-১২ লাখ টাকার সরকারি প্রকল্পে এত অল্প কাজ হয়ে থাকে, তাহলে এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত।”

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি অর্থে প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও মসজিদ কমিটিকে বরাদ্দ, প্রকল্প ব্যয় কিংবা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। ফলে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে প্রকল্পের ই-টেন্ডারে আবেদনকারী ইয়াহিয়া জানান, তিনি টেন্ডারে অংশ নিলেও প্রকল্পের মোট বরাদ্দ কত ছিল, সে বিষয়ে তাকে জানানো হয়নি।

তার দাবি, “বরাদ্দের পরিমাণ কিংবা প্রকল্পের কাগজপত্র আমাদের দেখানো হয়নি। জেলা পরিষদের কর্মকর্তারাই বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন।”

অন্যদিকে কার্যাদেশপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মমতাজ এন্টারপ্রাইজ-এর স্বত্বাধিকারী মো. ফরহাদুল মিজান জানান, তিনি কাজটি নিজে না করে সাব-ঠিকাদার বিল্লাল হোসেনকে দিয়ে বাস্তবায়ন করিয়েছেন।

তার বক্তব্য, “জেলা পরিষদের প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানেই কাজ হয়েছে। এখানে অনিয়ম হওয়ার কথা নয়।”

তবে বিল্লাল হোসেন জানান, তিনিও সরাসরি কাজ করেননি; বরং রিয়াদ নামের এক ব্যক্তির কাছে কাজটি হস্তান্তর করেন। রিয়াদ স্থানীয় এনসিপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিল্লাল আরও বলেন, “আমি কয়েক বছর ধরে সরাসরি কোনো কাজ করি না। ছোট ভাইদের মাধ্যমে কিছু কাজ হয়েছে।”

তবে কালের কণ্ঠের হাতে থাকা নথি অনুযায়ী, বিল্লালের দাবি থেকে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। নথিতে দেখা যায়, প্রকল্পের বাস্তবায়নের সঙ্গে বিল্লালের ছোট ভাই ইকবাল হোসেনের সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে।

এছাড়া স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিল্লাল হোসেন দেবিদ্বার ক্যাপ্টেন সুজাত আলী সরকারি কলেজের নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং জুলাই আন্দোলনের একটি হত্যা মামলার আসামি।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, সরকারি বরাদ্দের অর্থ নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা নয়ছয়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. গোলাম জাকারিয়া বলেন, “অভিযোগের বিষয়টি আমি নোট করেছি। তদন্ত করে যদি কোনো ধরনের অনিয়ম বা ব্যত্যয় পাওয়া যায়, তাহলে প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।