নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্রাহ্মণপাড়া (কুমিল্লা)

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় মাদক কারবারিদের সঙ্গে এক পুলিশ কর্মকর্তার কথিত যোগসাজশের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় মাদক সিন্ডিকেটকে সহযোগিতা, মাদকবিরোধী অভিযানের গোপন তথ্য আগাম ফাঁস, গ্রেফতারকৃত আসামিদের সহায়তা প্রদান এবং জব্দকৃত মাদকের পরিমাণ নিয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে ব্রাহ্মণপাড়া থানার এসআই সুজনের বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে এলাকাজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার কেশিয়ার, মন্দভাগ, হরিমঙ্গল, তেতাভূমি, আশাবাড়ি ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব এলাকায় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে তাদের সঙ্গে কিছু অসাধু ব্যক্তির সখ্যতা গড়ে উঠেছে, যার ফলে মাদক ব্যবসা আরও বিস্তার লাভ করছে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের ব্যবহার ও বিক্রি উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে যুবসমাজের একটি অংশ মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। তারা অভিযোগ করেন, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না।

অভিযোগকারীদের দাবি, ব্রাহ্মণপাড়া থানার এসআই সুজন দীর্ঘদিন ধরে একই এলাকায় কর্মরত থাকার সুযোগে বিভিন্ন মাদক কারবারির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। এর ফলে থানার পক্ষ থেকে পরিচালিত বিভিন্ন মাদকবিরোধী অভিযানের আগেই সংশ্লিষ্ট মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে তথ্য পৌঁছে যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অভিযানের পূর্বেই আসামিরা আত্মগোপনে চলে যায় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারে না।

স্থানীয় সূত্র আরও দাবি করে, মাদক পরিবহন ও ব্যবসা পরিচালনার জন্য বিকল্প পথ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করা হয় বলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ৩১ মে ২০২৬ তারিখে পরিচালিত এক মাদকবিরোধী অভিযানে ১১ কেজি গাঁজাসহ একজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয় এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আরও একজনকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ওই আসামিদের জামিন ও মুক্তির প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার উদ্দেশ্যে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং আইনজীবী নিয়োগের বিষয়েও তদারকির অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু কথিত সাংবাদিককে প্রভাবিত ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্ক আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো তদন্ত বা প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর মধ্যে একটি হলো জব্দকৃত মাদকের পরিমাণ নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, এক অভিযানে একটি পিকআপভ্যান থেকে প্রায় ১৮০ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হলেও আদালতে মাত্র ৮০ কেজি গাঁজা উপস্থাপন করা হয়। বাকি ১০০ কেজি গাঁজার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা হিসাব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় এলাকাবাসী নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, কুমিল্লা-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাজী জসিম উদ্দিনের উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন মাদকবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রেও অভিযানের আগেই সংশ্লিষ্ট আসামিদের কাছে তথ্য ফাঁস করা হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে অভিযানের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেন।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে এসআই সুজনের বক্তব্য জানার জন্য তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।

তবে ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক হোসেন অভিযোগের বিষয়ে বলেন,

“আমি এই থানায় যোগদানের পর থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। এরপরও যদি কোনো পুলিশ সদস্য ব্যক্তিগতভাবে কোনো মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন, সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। তবে থানার গোপন তথ্য কিংবা মাদকবিরোধী অভিযানের তথ্য কাউকে দেওয়া হলে সেটি অবশ্যই আইনবহির্ভূত কাজ। বিষয়টি আমাকে জানানো হয়েছে। আমি অভিযোগ খতিয়ে দেখব। মাদকের পক্ষে যে-ই থাকুক, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি আরও বলেন,

“আমি নতুন যোগদান করেছি। থানার সার্বিক বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের স্বার্থে উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান জোরদার করে যুবসমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

এলাকাবাসীর দাবি, ব্রাহ্মণপাড়ায় মাদকের বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।