মোঃ শাহজাহান বাশার
কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেলক্রসিংয়ে ভয়াবহ ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জন নিহত ও আটজন আহত হওয়ার ঘটনায় তদন্তে একাধিক পক্ষের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিলেছে। জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের ১১ পৃষ্ঠার বিস্তারিত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দিয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রণীত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার পেছনে রেলওয়ে ও সড়ক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের গাফিলতি ছিল স্পষ্ট।
দায়িত্বে অনুপস্থিত গেইটম্যান, টাকার বিনিময়ে দায়িত্ব হস্তান্তর
দুর্ঘটনার রাতে পদুয়ার বাজার রেলগেইটে দায়িত্বে থাকা দুই গেইটম্যান—মেহেদী হাসান ও হেলাল—নিজ দায়িত্বে উপস্থিত ছিলেন না। তারা এক হাজার টাকার বিনিময়ে কাউসার ও নাজমুল নামের দুই ব্যক্তির কাছে দায়িত্ব অর্পণ করেন। বিষয়টি তদন্তে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া পূর্ববর্তী বিজয়পুর লেভেলক্রসিংয়ের দায়িত্বে থাকা মশিউর রহমান ও বাবুল হোসেন ট্রেন আসার তথ্য পরবর্তী গেইটে জানাতে ব্যর্থ হন। তদন্তে তাদের কললিস্ট যাচাই করে দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় ফোনকল করা হয়নি।
স্টেশন মাস্টারের সতর্কবার্তার ঘাটতি
লালমাই রেলস্টেশনে দায়িত্বে থাকা সহকারী স্টেশন মাস্টার মো. বশিরুল্লাহও পদুয়ার বাজার গেইটকে ট্রেন চলাচল সম্পর্কে সতর্ক করেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকা মেইল ট্রেনের দুই লোকোমাস্টার সংকেত না পাওয়ার অজুহাতে ট্রেনের গতি কমাননি। ফলে সংঘর্ষের তীব্রতা বেড়ে যায়।
দৃশ্যমানতার ঘাটতি ও বাসচালকের বেপরোয়া আচরণ
তদন্তে উঠে এসেছে, লেভেলক্রসিংয়ের মাত্র ২০ ফুটের মধ্যে স্থাপনা থাকায় বাসচালকের পক্ষে ট্রেন দেখা কঠিন ছিল। তবে বাসচালক শহিদুল ইসলাম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়ও গতি কমাননি এবং বিকল্প ওভারপাস ব্যবহার করেননি। বাস কর্তৃপক্ষের তদারকিতেও ঘাটতি ছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সড়ক বিভাগের সমন্বয়হীনতা
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্মাণকাজ ও অব্যবস্থাপনাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রেল ও সড়ক বিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব ছিল বলে তদন্ত কমিটি মন্তব্য করেছে।
গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপ
দুর্ঘটনার পর তিন গেইটম্যানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অবহেলার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ভবিষ্যৎ নিরাপত্তায় ৮ দফা সুপারিশ
এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে তদন্ত কমিটি আটটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে—
১. লেভেলক্রসিং গেইটের নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা।
২. গেইটম্যানদের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা এবং মাদকাসক্ত প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুতি।
৩. সিগন্যাল লাইট ও সতর্ক ঘণ্টার বৈদ্যুতিক সংযোগ সচল রাখা।
৪. গেইটম্যানদের জন্য স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।
৫. রেল ও সড়ক কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জোরদার।
৬. দীর্ঘমেয়াদে স্বয়ংক্রিয় ব্যারিকেড ও আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু।
৭. ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিংয়ে বাস চলাচল নিয়ন্ত্রণ।
৮. বিআরটিএ’র নিয়মিত তদারকি বৃদ্ধি।
গোপনীয় কিছু তথ্য প্রকাশ হয়নি
তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, স্বার্থ ও গোপনীয়তার কারণে কিছু তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রতিবেদন অনুযায়ী, গেইটম্যান, স্টেশন মাস্টার, লোকোমাস্টার, বাসচালক ও সড়ক বিভাগের দায়িত্বশীলদের অবহেলা দুর্ঘটনার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।