মোঃ শাহজাহান বাশার
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি সাত মাস ধরে দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্ব দেন। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের ঠিক দু’দিন আগে, ১০ ফেব্রুয়ারি তার অফিস থেকে জারি হয় একটি প্রজ্ঞাপন—ড. ইউনূসকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ বা ভিআইপি ঘোষণা করে বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।
গেজেট প্রকাশিত হওয়ার পর জনমনে সৃষ্টি হয় বিস্ময় ও জল্পনা। স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, সব সরকারি গেজেট বিজি প্রেসের ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত থাকে, কিন্তু এই গেজেটটি ওয়েবসাইট থেকে হঠাৎ করে সরিয়ে দেওয়া হয়। বিজি প্রেসের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ জানান, “সরকারি নির্দেশনার কারণে কিছু গেজেট জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয় না। ড. ইউনূসের ক্ষেত্রেও একই কারণে গেজেট সরানো হয়েছে।”
গেজেটের মূল লক্ষ্য ছিল দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর ড. ইউনূসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ‘বিশেষ নিরাপত্তা আইন ২০২১’-এর অধীনে ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে প্রণীত বিধিমালার ভিত্তিতে বলা হয়েছে, দায়িত্ব হস্তান্তরের তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছর তিনি এসএসএফ নিরাপত্তা পাবেন।
নিরাপত্তার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো:
-
দায়িত্ব হস্তান্তরের পর ১ বছর নিরাপত্তা।
-
সার্বক্ষণিক এসএসএফ সুরক্ষা।
-
স্থায়ী ও অস্থায়ী বাসভবন ও কার্যালয়ে নিরাপত্তা তদারকি।
-
অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প বা দুর্ঘটনায় সরাসরি এসএসএফ সমন্বয়।
-
বাসভবন ও কার্যালয়ে দর্শনার্থী ও যানবাহনের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ।
-
অনুষ্ঠানে বাহিনীর কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কারো অস্ত্র বহন নিষেধ।
ড. ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, এই প্রক্রিয়ায় কোনো আইনি লঙ্ঘন হয়নি। তিনি ২০০১ সালের উদাহরণ টেনে বলেন, তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান-এর ক্ষেত্রেও অনুরূপ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে সমালোচকরা বলছেন, বিদায়ের মাত্র কয়েক দিন আগে নিজের জন্য বিশেষ সুবিধার গেজেট জারি করা এবং পরে তা ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া স্বচ্ছতার পরিপন্থী।
১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বে নতুন সরকার শপথ গ্রহণের মাধ্যমে ড. ইউনূসের সরকারের মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি সরকারি বাসভবন ত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে এসএসএফ-এর সুরক্ষায় রয়েছেন।
তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—যে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় বিশেষ সুবিধা ভোগ করছেন, তা জনসাধারণের নজরে কেন রাখা হয়নি। বিজি প্রেস জানাচ্ছে এটি সরকারি নির্দেশনা, কিন্তু কবে থেকে এবং কোন পর্যায়ে এই গোপনীয়তার আদেশ এসেছে তা এখনও জনসাধারণের জন্য অজানা।
এই ঘটনায় প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গন দুইই উত্তপ্ত। একদিকে আইনগত দায়মুক্তি রয়েছে বলে দাবি, অন্যদিকে স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচনা চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রক্রিয়াগত পদক্ষেপ প্রয়োজন, কিন্তু তা জনসাধারণের চোখের আড়ালে হলে কৌতূহল ও সন্দেহ বাড়ে।”