মোঃ শাহজাহান বাশার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন-কে অভিশংসনের প্রস্তাব প্রথম অধিবেশনেই তোলা হতে পারে—এমন আভাস দিয়েছে বিরোধীদলীয় জোটের একাধিক শীর্ষ নেতা। আগামী ১২ মার্চ বসতে যাওয়া এই অধিবেশনেই বিষয়টি সংসদে উত্থাপনের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।

পুরোনো দাবি, নতুন প্রেক্ষাপট

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের দাবি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে উঠেছিল। তবে সাংবিধানিক জটিলতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থানের কারণে এতদিন বিষয়টি বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে রাষ্ট্রপতির দেওয়া সাক্ষাৎকার ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম হয়। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করেছে—রাষ্ট্রপতি শপথ ভঙ্গ করেছেন এবং ‘অভ্যন্তরীণ’ বিষয় জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন।

১১ দলীয় জোটের অবস্থান

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধীদলীয় জোট জানিয়েছে, তারা সংসদের প্রথম অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব আনতে ইতিবাচক। জোটের নেতারা বলছেন, নতুন সংসদ গঠিত হওয়ায় এখন আর সাংবিধানিক শূন্যতার অজুহাত নেই।

জোটভুক্ত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দলটির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম প্রকাশ্যে রাষ্ট্রপতির অভিশংসন ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “সংসদের প্রথম অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। গণহত্যার সময় তার নীরব ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।”

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া-ও একই দাবি তুলে ধরে বলেন, নতুন সংসদকে ‘ফ্যাসিবাদের ধারাবাহিকতা’ থেকে মুক্ত রাখতে হলে রাষ্ট্রপতির অভিশংসন জরুরি।

সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কী বলছে?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যায়। এর জন্য—

  • সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত অভিযোগ স্পিকারের কাছে দাখিল করতে হয়
  • ১৪ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে প্রস্তাব সংসদে আলোচিত হতে হয়
  • সদস্যসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়

তবে দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের নজির নেই। ২০০২ সালে বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী-এর বিরুদ্ধে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তিনি ভোটাভুটির আগেই পদত্যাগ করেন।

জামায়াতের সতর্ক অবস্থান

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “দেশের স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্তই আমরা নেব।”

সরকারের অবস্থান

অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে—সংবিধান অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতিই ভাষণ দেবেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণ বাধ্যতামূলক।”

আইনি চিঠি ও রাজনৈতিক চাপ

এদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠি দিয়ে রাষ্ট্রপতিকে উদ্বোধনী ভাষণ থেকে বিরত রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন। চিঠিতে ‘জুলাই বিপ্লবের চেতনা’ রক্ষার যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।

সামনে কী?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী জোট প্রস্তাব তুললেও তা কার্যকর করতে সরকারি দলের সমর্থন প্রয়োজন হবে। কারণ দুই-তৃতীয়াংশ ভোট ছাড়া অভিশংসন সম্ভব নয়। ফলে বিষয়টি এখন নির্ভর করছে সংসদের ভেতরের সংখ্যার রাজনীতির ওপর।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন তাই শুধু আনুষ্ঠানিক সূচনা নয়, বরং সম্ভাব্য সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে। রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রশ্নে দেশজুড়ে নতুন বিতর্কের সূচনা হয়েছে—যার পরিণতি নির্ধারণ করবে সংসদের ভোটাভুটি ও রাজনৈতিক সমীকরণ।