মোঃ শাহজাহান বাশার

দুর্নীতির দায়ে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এবং সাজা প্রাপ্ত হওয়ার পরও তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি’র (Titas Gas Transmission & Distribution PLC) এক কর্মচারী বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কারাভোগের সময়ও বেতন গ্রহণ করেছেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযুক্ত কর্মচারীর নাম মোঃ আসাদুজ্জামান। তিনি তিতাস গ্যাসে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। রাষ্ট্রের সম্পদ ও জনগণের রাজস্বের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে ঢাকা বিশেষ মামলা নং–০৬/২৩, স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল–৬ এর ৭ আগস্ট ২০২৫ তারিখের রায়ে তাকে ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা প্রদান করা হয়।

এছাড়াও বিশেষ মামলা নং–০১/২৩, স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল–৬ এ ১নং আসামি মিসেস সুরাইয়া বেগম (ঝর্না) এবং ২নং আসামি মোঃ আসাদুজ্জামান উভয়কে পৃথকভাবে ৩ বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। ফলে দুটি মামলায় মোঃ আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে মোট ৬ বছরের কারাদণ্ড কার্যকর হয়।

রায়ে উল্লেখ করা হয়, বিচার চলাকালীন তিনি পলাতক ছিলেন। পরবর্তীতে ৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে রাজনৈতিক প্রভাব ও জামিনের মাধ্যমে তিনি পরবর্তীতে মুক্তি পান বলে অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাজাপ্রাপ্ত এই কর্মচারী কারাগারে থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের বেতন উত্তোলন করেছেন। অথচ তিতাস গ্যাসের কর্মচারী প্রবিধানমালা অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাবরণ করলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।

অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বহাল রাখা হয়েছে এবং তিনি নিয়মিত অফিসে প্রবেশ করছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে জানা যায়, মোঃ আসাদুজ্জামান একজন সাধারণ ইলেকট্রিশিয়ান পদে কর্মরত থেকেও অস্বাভাবিকভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার মালিকানায় রয়েছে—ফতুল্লা, মাতুয়াইল ও নারায়ণগঞ্জ পোস্ট অফিস রোডে ১০, ১১ ও ১৪ তলা ভবন, একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, শতকোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ, এবং দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, তিনি অবৈধ গ্যাস সংযোগ ও মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিতেন। এছাড়া জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিধিমালা অনুযায়ী, আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর ক্ষেত্রে Self Dismissal বা তাৎক্ষণিক চাকরিচ্যুতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ সেই বিধান কার্যকর না করায় নানা প্রশ্ন উঠেছে—প্রশাসন কি ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে, নাকি এর পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী কোনো মহলের ছত্রছায়া?

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জিএম (প্রশাসন) লুৎফর রহমান কোনো মন্তব্য করেননি। অন্যান্য কর্মকর্তারাও ‘মিটিং’-এর অজুহাতে সাংবাদিকদের এড়িয়ে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে মোঃ আসাদুজ্জামানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে কল রিসিভ করলেও পরিচয় জানানো মাত্র সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একজন সাধারণ ইলেকট্রিশিয়ান কীভাবে এত বিপুল সম্পদের মালিক হন, তা সঠিকভাবে তদন্ত না করা এবং সাজাপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও তাকে চাকরিতে বহাল রাখা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও উৎসাহিত করবে।

সচেতন মহলের মতে, এই ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে তিতাস গ্যাসের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনগণের স্বার্থ চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।

এই বিষয়ে আরও তদন্তের জন্য তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ এবং মহাব্যবস্থাপক মানবসম্পদ ডিভিশন মো. লুৎফুল হায়দার মাসুমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কলটি কেটে দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ কর্পোরেশন (পেট্রোবাংলা) কর্তৃপক্ষের তদন্তের জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলো।