মোঃ শাহজাহান বাশার
রাজনীতির ইতিহাসে চাটুকারিতা বা তেলবাজি কোনো নতুন বিষয় নয়। তবে আধুনিক গণতন্ত্রে এর রূপ, ব্যাপ্তি ও ক্ষতিকর প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভয়াবহ। সম্প্রতি ভারতের সাবেক রেলমন্ত্রী ও বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদবের একটি সংসদীয় বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই বক্তব্য আসলে ব্যক্তি আক্রমণ নয়, বরং ক্ষমতার চারপাশে গড়ে ওঠা চাটুকার শ্রেণির বিরুদ্ধে এক তীব্র রাজনৈতিক ব্যঙ্গ।
ঘটনাটি ঘটে লোকসভায়, কংগ্রেস আমলে। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মনমোহন সিং, কিন্তু বাস্তব ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন সোনিয়া গান্ধী। সেই প্রেক্ষাপটে লালুপ্রসাদ যাদব সংসদে দাঁড়িয়ে সতর্ক করে বলেছিলেন—“ম্যাডামজি, টিটিএমপি থেকে সাবধান।” প্রথমে সংসদ সদস্যরা বিস্মিত হয়ে ভাবেন, টিটিএমপি বুঝি কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন। পরে লালু ব্যাখ্যা করেন—টিটিএমপি মানে তেল তোড়কে মালিশ পার্টি। অর্থাৎ সেই শ্রেণি, যাদের একমাত্র কাজ ক্ষমতাবানের চারপাশে ঘুরে প্রশংসার মালিশ করা।
এই বক্তব্যে সংসদ যেমন হেসে উঠেছিল, তেমনি নগ্ন সত্যও উন্মোচিত হয়েছিল—ক্ষমতার আশেপাশে থাকা চাটুকাররাই শেষ পর্যন্ত শাসক ও শাসনব্যবস্থাকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে।
চাটুকারিতার এই রাজনীতি নতুন নয়। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলেই দেখা যায়, রাজদরবার মানেই ছিল তেলবাজদের নিরাপদ আশ্রয়। প্রাচীন ভারতের সম্রাট হর্ষবর্ধনের দরবার এবং আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুরের দরবার—এই দুই ঘটনাই তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু তাঁর ‘দ্য গ্লিমসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’ গ্রন্থে সম্রাট হর্ষবর্ধনের দরবারের একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সম্রাট হর্ষ ছিলেন প্রজাবৎসল ও জ্ঞানানুরাগী শাসক। তাঁর সভাকবি বানভট্ট ছিলেন তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। কিন্তু প্রতিভার পাশাপাশি তাঁর চরিত্রে ছিল সুযোগসন্ধানী চাটুকারিতার দাগ।
সম্রাটের কবি হওয়ার আগ্রহকে পুঁজি করে বানভট্ট গোপনে উৎকৃষ্ট কবিতা লিখে সেগুলো সম্রাটের নামে প্রচার করতে থাকেন। এতে সম্রাটের সুনাম যেমন বাড়ে, তেমনি কবিদের মধ্যে অসন্তোষও দানা বাঁধে। একপর্যায়ে বিষয়টি প্রকাশ পেলে সম্রাট হর্ষবর্ধন কঠোর সিদ্ধান্ত নেন। প্রকাশ্য দরবারে বানভট্টকে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে পদচ্যুত ও বহিষ্কার করেন। এরপর তিনি যে মন্তব্যটি করেন, তা আজও রাজনৈতিক বাস্তবতার নির্মম সত্য—
“রাজার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো চাটুকার, কিন্তু সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো—চাটুকার ছাড়া রাজনীতি চলে না।”
একই ধরনের ঘটনা পাওয়া যায় আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুরের দরবারে। ইমাম গাজ্জালীর ‘ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন’ গ্রন্থে বর্ণিত আছে, খলিফা মনসুর মিথ্যা প্রশংসা ও তেলবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে একদিন এমন একজন সত্যবাদী আলেম খুঁজে আনার নির্দেশ দেন, যিনি নির্ভয়ে সত্য বলতে পারেন।
এই অনুসন্ধানে দরবারে উপস্থিত হন ওয়াসিল ইবনে আতা। তিনি একের পর এক বিবদমান পক্ষ, গভর্নর এবং শেষ পর্যন্ত স্বয়ং খলিফার চরিত্র সম্পর্কে নির্মম সত্য উচ্চারণ করেন। তাঁর সত্যভাষণ এতটাই তীব্র ছিল যে খলিফা শেষ পর্যন্ত তাঁকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হন। সত্য শোনার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও সত্য সহ্য করার মানসিকতা ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছালে অনেক সময় হারিয়ে যায়—এই ঘটনাই তার প্রমাণ।
এই দুই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, লালুপ্রসাদ যাদবের সংসদীয় ব্যঙ্গ এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক সুতোয় গাঁথা। স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশে ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী তেল মালিশ পার্টি গড়ে উঠেছে, যারা আদর্শ নয়—ক্ষমতাকেই রাজনীতির শেষ কথা বানিয়েছে। এদের কারণে যোগ্যতা, সততা ও ভিন্নমত রাজনীতি থেকে নির্বাসিত হয়েছে।
আজকের বাংলাদেশে রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে আর জনসেবার হাতিয়ার নয়; বরং তা হয়ে উঠেছে চাটুকারদের নিরাপদ জীবিকা। ইতিহাস আমাদের বারবার সতর্ক করেছে—চাটুকাররা সাময়িকভাবে শাসককে খুশি করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র, সমাজ এবং শাসক—সবাইকে ডুবিয়ে ছাড়ে।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে, তেলবাজির এই রাজনীতি একদিন সব সম্ভাবনাকেই নিঃশেষ করে দেবে—এটাই ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম।