মোঃ শাহজাহান বাশার
২০২৫ সালটি মানব ইতিহাসে এমন এক সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যখন বিশ্ব ক্ষমতার কেন্দ্র নীরবে কিন্তু গভীরভাবে স্থানান্তরিত হতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী যে বৈশ্বিক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল, সেই ব্যবস্থার ভিত প্রথমবারের মতো এত প্রকাশ্যভাবে নড়বড়ে হয়ে পড়ে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ঘিরে প্রযুক্তি ও পুঁজির অভূতপূর্ব বিস্তার, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পুনরুত্থান—এই দুই বিপরীত স্রোত ২০২৫ সালকে বৈশ্বিক রাজনীতির এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে।
এই রূপান্তরের কেন্দ্রে ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রে তার নাটকীয় প্রত্যাবর্তন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই নয়, পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে।
২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথগ্রহণ ছিল বছরের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ঘটনা। ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক রীতিনীতি ভেঙে দেন। কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার বক্তব্য, ডেনমার্কের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ, ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্রদের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের আচরণ হয়ে ওঠে আগ্রাসী ও একমুখী।
এর ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে শুরু হয় নতুন মেরুকরণ। যুক্তরাষ্ট্র আর ‘নিয়মভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থার রক্ষক’ হিসেবে নয়, বরং নিজস্ব স্বার্থনির্ভর শক্তির রাজনীতির প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়।
ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ পুরোপুরি থামাতে না পারলেও যুদ্ধের কূটনৈতিক সমীকরণ বদলে দেয়। ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের আগের অবস্থান শিথিল হওয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়। গাজায় ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতি এলেও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপে দক্ষিণপন্থি রাজনীতির উত্থান আরও ত্বরান্বিত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংহতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সদস্য দেশগুলো নিজেদের সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে নতুন হিসাব কষতে শুরু করে।
২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতির আরেকটি বড় আলোচ্য বিষয় ছিল ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির পাল্টা হিসেবে ইউরোপ ও চীনও শুল্ক বাড়ালে বিশ্বজুড়ে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকে। উন্নয়নশীল দেশগুলো পড়ে তীব্র ডলার সংকটে।
এর ফলে ডলারকে ঘিরে দীর্ঘদিনের আস্থা প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিকল্প মুদ্রা ও আঞ্চলিক লেনদেন ব্যবস্থার আলোচনা জোরালো হয়, যা ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামো বদলে দিতে পারে।
অর্থনৈতিক বৈষম্যের দিক থেকে ২০২৫ ছিল এক বিস্ময়কর বছর। ফোর্বসের তথ্যমতে, এ বছরে বিশ্বে নতুন করে ৩৪০ জন বিলিয়নিয়ার যুক্ত হয়েছেন—গড়ে প্রতিদিন একজন করে। বর্তমানে বিশ্বে মোট বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৪৮ জন, যাদের সম্মিলিত সম্পদ প্রায় ১৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার।
এই বিপুল সম্পদের মূল চালিকাশক্তি ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এআই শুধু প্রযুক্তি খাতেই নয়, বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্যেও নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার কিংবা মুক্ত বাণিজ্যের নেতৃত্ব দেয়নি। বরং এসব মূল্যবোধ থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সেই বিশ্ব ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে, যা তারা নিজ হাতে গড়ে তুলেছিল।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আবারও সরে দাঁড়ানো, মানবাধিকার ইস্যুতে নরম অবস্থান, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধ—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সাল চীনের জন্য তুলনামূলক স্বস্তির বছর ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখেও বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে পাল্টা কৌশল নেয়। এতে অনেক ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটনকে পিছু হটতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বায়ন ভাঙেনি; তবে এর চালকের আসনে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে নেই। ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে বহু-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।
২০২৫ সাল দেখিয়ে দিয়েছে—বিশ্ব ব্যবস্থা স্থির নয়, বরং পরিবর্তনশীল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে মানেই শূন্যতা তৈরি হচ্ছে না; বরং সেই জায়গা দখল করছে নতুন শক্তি, নতুন প্রযুক্তি ও নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ইতিহাস হয়তো এই বছরটিকে স্মরণ করবে সেই মুহূর্ত হিসেবে, যখন বিশ্ব এক নতুন যুগে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছিল।