মোঃ শাহজাহান বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
সিরাজগঞ্জ: এক হৃদয়বিদারক ও মানবিক ঘটনায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়। ফুটপাতে সন্তান জন্ম দিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নিখোঁজ হয়ে গেছেন সদ্যপ্রসূতা এক মা। তবে নবজাতক কন্যাশিশুটি এখন নিরাপদে রয়েছে এবং তাকে দত্তক নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার (৬ অক্টোবর) রাত ২টার দিকে। স্থানীয় একটি হাসপাতালের পাশে এক নারীর যন্ত্রণাকাতর চিৎকার শুনে ছুটে যান আশপাশের মানুষ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফুটপাথেই জন্ম নেয় একটি ফুটফুটে কন্যাশিশু।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাতের নীরবতা ভেঙে এক নারীর আর্তচিৎকার শুনে কয়েকজন পথচারী দ্রুত এগিয়ে যান। পরে দেখা যায়, ওই নারী ফুটপাথে বসেই সন্তান প্রসব করছেন। স্থানীয়রা সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে কাপড়ে ঢেকে দেন এবং নবজাতকসহ কাছের হাসপাতালে নিয়ে যান।
তবে চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই ঘটে আরেকটি বিস্ময়কর ঘটনা—সদ্যপ্রসূতা মা অদৃশ্য হয়ে যান হাসপাতাল থেকে।
উল্লাপাড়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, “রাত ২টার দিকে হোয়াটসঅ্যাপে বিষয়টি জানতে পারি। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় মা ও নবজাতককে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই দেখা যায়, মা পালিয়ে গেছেন।”
তিনি আরও জানান, নবজাতক বর্তমানে উল্লাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং সম্পূর্ণ সুস্থ আছে। সকাল থেকেই অনেকেই শিশুটিকে দত্তক নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু সালেহ মোহাম্মদ হাসনাত বলেন, “বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। শিশুটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে উপযুক্ত ও দায়িত্বশীল অভিভাবকের কাছে শিশুটিকে হস্তান্তর করা হবে।”
তিনি আরও জানান, শিশুটি যেন কোনো অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির শিকার না হয়, সেজন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হচ্ছে।
স্থানীয়দের ধারণা, ওই নারী মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হতে পারেন। কারণ, প্রসবের আগে বা পরে কেউ তাঁর স্বজন হিসেবে সামনে আসেননি, এমনকি কেউ তাঁর পরিচয়ও নিশ্চিত করতে পারেননি।
এ প্রসঙ্গে এক স্থানীয় সমাজকর্মী বলেন, “এটি নিঃসন্দেহে একটি মানবিক সংকট। মা হয়তো মানসিক অসুস্থতার কারণে পালিয়ে গেছেন। কিন্তু শিশুটি যেন নিরাপদ ভবিষ্যৎ পায়, সেটিই এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয়।”
ঘটনাটি প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই নবজাতকের দায়িত্ব নিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন, কেউ কেউ আবার মায়ের সন্ধান চেয়ে আবেদন করছেন।
স্থানীয় নারী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও শিশুটির যত্ন ও সুরক্ষার বিষয়ে প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।
সন্তান জন্মের পর একটি মা যদি ফুটপাথ থেকে অজানায় হারিয়ে যান—এটি কেবল একটি খবর নয়, এটি সমাজের এক বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি। আমাদের মানবিকতার জায়গা থেকে এই শিশুটির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা এখন সবার দায়িত্ব। পাশাপাশি, সেই নিখোঁজ মায়ের খোঁজে প্রশাসনকে আরও জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে—যাতে জানা যায়, কেন একজন মা এমন পরিস্থিতিতে নিজের নবজাতককে ফেলে যেতে বাধ্য হলেন।