
মো. শাহজাহান বাশার
“শিক্ষা ও সংস্কৃতি—এই দুই ধারাই একটি জাতির আত্মা।”
কথাটি শুধু সাহিত্যিক ভাবেই নয়, বাস্তবতার গভীর চিত্রও তুলে ধরে। একটি জাতি তখনই টিকে থাকে, যখন তার মানুষ শিক্ষায় আলোকিত ও সংস্কৃতিতে শেকড়-প্রোথিত হয়।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমাগত পরিবর্তন ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন পাঠ্যক্রম, ডিজিটাল শিক্ষা, মূল্যায়ন পদ্ধতির রূপান্তর—সবকিছুই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সময়োপযোগী করে তুলতে চেষ্টা করছে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি কেবল পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা গড়ে তুলছি, নাকি প্রকৃত অর্থে মানবিক শিক্ষা দিচ্ছি?
শিক্ষা তখনই ফলপ্রসূ হয়, যখন ছাত্র কেবল তথ্য মুখস্থ না করে—বিচার-বুদ্ধি, নৈতিকতা ও মানবিকতা শেখে। আজকের সমাজে সেই মানবিক বোধের অভাবই আমাদের বড় দুর্বলতা।
সংস্কৃতি হলো জাতির আত্মপরিচয়। গান, কবিতা, নাটক, লোকসংগীত, উৎসব—এসবই আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য বহন করে। কিন্তু আজকের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই স্থানীয় সংস্কৃতির চেয়ে পাশ্চাত্য অনুকরণে বেশি আগ্রহী।
এটি দোষ নয়, তবে অন্ধ অনুকরণ বিপজ্জনক। আমরা যদি নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা হারাই, তাহলে জাতি হিসেবে আত্মপরিচয় হারাবো।
গ্রামে-গঞ্জে যেভাবে একসময় পালাগান, বাউল সঙ্গীত বা নাট্যচর্চা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করত, আজ সেগুলো বিলুপ্তপ্রায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুততার ভিড়ে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি যেন নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দেয়, আর সংস্কৃতি দেয় চরিত্র, সৌন্দর্য ও সংবেদনশীলতা।
একজন শিক্ষিত মানুষ যদি সংস্কৃতিবিমুখ হয়, তবে তার শিক্ষা কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে। আবার, সংস্কৃতি যদি শিক্ষার আলো না পায়, তবে তা কুসংস্কারে রূপ নেয়। তাই শিক্ষা ও সংস্কৃতির সমন্বয়ই প্রকৃত জাতি গঠনের চাবিকাঠি।
শিক্ষিত সমাজ মানে কেবল সার্টিফিকেটধারী নয়, বরং নৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সচেতন নাগরিক। আমাদের স্কুল-কলেজে নৈতিক শিক্ষা, সাহিত্যচর্চা, সংগীত, নাটক ও বিতর্কচর্চাকে আবার গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিবারেও সংস্কৃতি চর্চা বাড়াতে হবে—সন্তানদের বই পড়া, সংগীত শোনা, নাটক দেখা, কবিতা আবৃত্তির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে।
একটি জাতি তখনই মহৎ হয়, যখন তার শিক্ষা মানুষকে করে মানবিক, সংস্কৃতি করে সংবেদনশীল, আর সমাজ করে ঐক্যবদ্ধ।
বাংলাদেশের এই যাত্রায় আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব—নিজেকে শিক্ষিত করা, এবং সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।
কারণ শিক্ষা ও সংস্কৃতি—এই দুটোই আমাদের অস্তিত্বের দুটি ডানা। এক ডানা ভাঙলে উড়তে পারা যায় না।