
মোঃ শাহজাহান বাশার
মাদক—একটি ছোট শব্দ, কিন্তু এর প্রভাব ভয়াবহ ও বহুমাত্রিক। এটি কেবল একজন মানুষকে নয়, একটি পরিবারকে নয়; ধীরে ধীরে একটি সমাজকে এবং শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। মাদকের আগ্রাসন নিঃশব্দে বিস্তার লাভ করে—বন্ধুত্বের ছদ্মবেশে, হতাশার অন্ধকারে, কৌতূহলের সূচনায় কিংবা সামাজিক অবহেলার সুযোগে। একবার কেউ এর কবলে পড়লে ফিরে আসার পথ হয়ে যায় অত্যন্ত কঠিন, কখনও কখনও প্রায় অসম্ভব।
আজ আমাদের চারপাশে তাকালেই দেখা যায়—মাদকের ছোবলে নষ্ট হচ্ছে অসংখ্য সম্ভাবনাময় তরুণ জীবন। যে যুবকটি হতে পারত একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, গবেষক কিংবা সফল উদ্যোক্তা—সে আজ আসক্তির অন্ধকার গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবারে সৃষ্টি হচ্ছে অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট, মানসিক বিপর্যয় ও সম্পর্কের ভাঙন। সন্তানের আসক্তি বাবা-মায়ের চোখের ঘুম কেড়ে নেয়; ভাইয়ের আসক্তি বোনের স্বপ্ন ভেঙে দেয়; স্বামীর আসক্তি স্ত্রীর জীবনকে করে তোলে অনিশ্চিত ও নিরাপত্তাহীন। একটি পরিবারের এই ভাঙন ক্রমে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে বহুগুণে।
মাদকাসক্তি কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট। মাদকের অর্থনীতি অপরাধ জগতকে শক্তিশালী করে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নড়বড়ে করে এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। চুরি, ছিনতাই, সহিংসতা—অনেক অপরাধের পেছনে মাদকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। তাই মাদকবিরোধী লড়াইকে কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি হতে হবে সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত আন্দোলন।
মাদক প্রতিরোধের প্রথম ও সবচেয়ে কার্যকর ক্ষেত্র হলো পরিবার। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, তার মানসিক অবস্থা কেমন—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন ও সংবেদনশীল হতে হবে। শাসন নয়, প্রয়োজন সংলাপ; ভীতি নয়, প্রয়োজন বিশ্বাস। ভালোবাসা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই হতে পারে সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় সুরক্ষা বলয়।
স্কুল-কলেজে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি, সেমিনার, আলোচনা সভা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা ও জীবনদক্ষতা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাদকের বিরুদ্ধে দৃঢ় নৈতিক অবস্থান নিতে হবে। সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী দল ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ঐকমত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি কার্যকর জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ বন্ধে কঠোর নজরদারি জোরদার করতে হবে। চোরাকারবারি ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের আইনের আওতায় আনতে হবে—কোনো ধরনের ছাড় নয়।
একই সঙ্গে পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। যারা ইতোমধ্যে আসক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের কেবল শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং সামাজিক পুনর্বাসন। শাস্তির পাশাপাশি মানবিক পুনর্গঠনই হতে পারে টেকসই সমাধান।
যুবসমাজ একটি দেশের প্রাণশক্তি। এই শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করা না গেলে তা হয়ে উঠতে পারে সামাজিক বোঝা। তরুণদের সময়, শক্তি ও সৃজনশীলতাকে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করতে খেলাধুলার বিকল্প সত্যিই নেই।
খেলাধুলা শারীরিক সুস্থতা বাড়ায়, মানসিক প্রশান্তি দেয়, দলগত চেতনা গড়ে তোলে এবং শৃঙ্খলাবোধ সৃষ্টি করে। মাঠে যারা সময় কাটায়, তারা সাধারণত মাদকের আড্ডা থেকে দূরে থাকে। তাই প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ সংরক্ষণ, ক্রীড়া সামগ্রীর সহজলভ্যতা নিশ্চিতকরণ, নিয়মিত টুর্নামেন্ট আয়োজন এবং ক্রীড়া ক্লাব সক্রিয় করা জরুরি।
শুধু ক্রিকেট বা ফুটবল নয়—কাবাডি, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, মার্শাল আর্টসহ বিভিন্ন খেলাকে জনপ্রিয় করতে হবে। পাশাপাশি নাটক, সংগীত, আবৃত্তি, বিতর্ক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তরুণদের জন্য ইতিবাচক বিকল্প পরিসর তৈরি করতে পারে।
মাদকবিরোধী লড়াই একদিনে জেতা সম্ভব নয়। কিন্তু পরিবার, সমাজ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র যদি একসঙ্গে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়—তবে পরিবর্তন অবশ্যই সম্ভব।
আমাদের মনে রাখতে হবে—প্রতিটি আসক্ত যুবক একটি হারানো সম্ভাবনা; আর প্রতিটি রক্ষা পাওয়া তরুণ একটি নতুন সূর্যোদয়। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলি। যুবসমাজকে খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করি।
একটি সুস্থ, সচেতন ও শক্তিশালী জাতি গঠনের স্বপ্নে—মাদকমুক্ত সমাজ হোক আমাদের দৃঢ় প্রত্যয়।