
মোঃ শাহজাহান বাশার
দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্রমবর্ধমান আইনশৃঙ্খলা অবনতি, নারী ও শিশু নির্যাতন, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এবং দুর্নীতির ঘটনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদ ও সমাজ সচেতন মহল। তাদের মতে, কেবল আইন প্রয়োগ কিংবা প্রশাসনিক কঠোরতা দিয়ে সমাজের এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা এবং মনুষ্যত্ববোধের পুনর্জাগরণ।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অপরাধের খবর সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, বস্তুগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়ায় সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো, অর্থনীতি বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে নাগরিকদের নৈতিকতা, সততা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর। যখন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করে নীরব থাকে কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থে অন্যের ক্ষতি করতে দ্বিধা করে না, তখন সমাজে অপরাধ ও অনিয়ম বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিবারই একটি শিশুর প্রথম শিক্ষালয়। শিশুদের মধ্যে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, মানবিকতা এবং অন্যের প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব সর্বপ্রথম পরিবারকেই নিতে হবে। বাবা-মায়ের আচরণ ও জীবনাচরণ শিশুদের ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধুমাত্র ভালো ফলাফল বা আর্থিক সফলতার দিকে গুরুত্ব না দিয়ে সন্তানদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও নৈতিক শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের ওপর অধিক গুরুত্বারোপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় পেশাগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নাগরিক সচেতনতার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষকরা শুধু পাঠদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন; তারা শিক্ষার্থীদের জীবন গঠনের অন্যতম পথপ্রদর্শক।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম জোরদার করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একসময় সমাজে লাইব্রেরি, সাংস্কৃতিক ক্লাব, সাহিত্যচর্চা ও খেলাধুলা তরুণদের সুস্থ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। বর্তমানে প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদকাসক্তি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে সেই পরিবেশ অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তরুণ সমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে সাংস্কৃতিক চর্চা ও খেলাধুলার সুযোগ বৃদ্ধি করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ধর্মীয় নেতারাও মনে করেন, ধর্মের মূল শিক্ষা হলো মানবকল্যাণ, ন্যায়বিচার, সততা ও অন্যের অধিকার রক্ষা। ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো থেকে যদি নিয়মিতভাবে দুর্নীতি, নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদক ও সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হয়, তবে তা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে গণমাধ্যমের দায়িত্ব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সচেতন মহলের মতে, শুধু অপরাধের সংবাদ প্রচার নয়, বরং সমাজের ইতিবাচক উদ্যোগ, সৎ ও মানবিক মানুষের গল্প এবং অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বদের তুলে ধরা প্রয়োজন। এতে তরুণ প্রজন্ম ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত হবে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা তৈরি হবে।
সোনার বাংলা কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজা সৌরভ বলেন, “সমাজ পরিবর্তনের জন্য প্রথমে নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে। আমরা যদি প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে সততা, মানবিকতা এবং ন্যায়পরায়ণতার চর্চা করি, তাহলে একটি সুন্দর ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।”
তিনি আরও বলেন, “ঘুষ না দেওয়া, ট্রাফিক আইন মেনে চলা, প্রতিবেশীর বিপদে এগিয়ে যাওয়া কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা—এসব ছোট ছোট কাজই সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।”
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নৈতিক জাগরণ, মানবিক শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। তারা সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে মানবিক মূল্যবোধ চর্চা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মানবিকতা, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার আলোয় আলোকিত একটি সমাজই পারে নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
সেলিম রেজা সৌরভ, অধ্যক্ষ, সোনার বাংলা কলেজ, বুড়িচং, কুমিল্লা।